সূর্য দেবের পুজো

সূর্য দেবের পুজো

হিন্দুধর্মের বিভিন্ন দেবদেবীর মধ্যে প্রধান হলেন সৌর দেবতা (Surya Deb)। তিনি কশ্যপ ও অদিতির পুত্র। আবার কোনো কোনো পুরাণ মতে তিনি ইন্দ্রের পুত্র। কোন দেবতাকে খালি চোখে সামনা সামনি দেখা না গেলেও কিন্তু সূর্যদেবকে আমরা আকাশের দিকে তাকালেই দেখাতে পাই। সপ্তাহের সাতদিনের মধ্যে রবিবারটা রাখা থাকে সূর্য দেবতার জন্য।

রবিবার সূর্য দেবের উপাসনা করার নিয়ম রয়েছে। হিন্দু ধর্মের পৌরাণিক বিশ্বাস অনুসারে, সূর্য ঈশ্বর প্রত্যক্ষ দৃশ্যমান দেবতা। পৌরাণিক বেদে সূর্যকে পৃথিবীর প্রাণ এবং ঈশ্বরের চক্ষু হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সূর্যের উপাসনা জীবনশক্তি, মানসিক শান্তি, শক্তি এবং জীবনে সাফল্য নিয়ে আসে। এই কারণেই মানুষ উদীয়মান সূর্য দেখা শুভ বিবেচনা করে এবং সূর্যকে অর্ঘ্য অর্পণ করা পবিত্র বলে মনে করা হয়। আরেকটি বিশ্বাস হ'ল রবিবার সূর্য দেবের পুজো করলে সমস্ত ইচ্ছা পূরণ হয়। 

মৎস্য পুরাণ অনুসারে, এটি সম্পূর্ণরূপে ভগবান সূর্যদেবকে উত্সর্গীকৃত। এই দিনে করা স্নান, দান, বাড়ি, পুজো ইত্যাদি হাজার গুণ বেশি ফল দেয়। এই দিন ভক্তরা সূর্যোদয়ের আগে গঙ্গায় পূণ্যস্নান করতে যান। এটি বিশ্বাস করা হয় যে এই সময়ে পবিত্র স্নান করা একজন ব্যক্তিকে সমস্ত রোগ থেকে মুক্তি দেয় এবং তিনি একজন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হন।

স্নানের পরে সূর্যোদয়ের সময় ভক্তরা সূর্যদেবের উদ্দেশ্যে অর্ঘ্যদান করেন। এই সময়ে, সূর্যের দিকে মুখ করে ঘিয়ের প্রদীপ এবং লাল ফুল, কর্পূর এবং ধূপ দিয়ে সূর্যের উপাসনা করা উচিৎ। এই সমস্ত রীতি পালন করলে সূর্যদেব সুস্বাস্থ্যের দীর্ঘায়ু ও সাফল্য প্রদান করেন বলে মনে করা হয়। 

ভারতে সূর্য্যোপাসনার জন্য প্রসিদ্ধ পার্বণ হল ছট পূজা। এটি বছরে দুবার পালিত হয় — প্রথমবার চৈত্র মাসে (চৈতী ছট) এবং দ্বিতীয়বার কার্তিক মাসে (কার্তিকী ছট)। পারিবারিক সুখ-সমৃদ্ধি তথা মনোবাঞ্ছিত ফল লাভের জন্য এটি পালন করা হয়। নারী-পুরুষ সমানভাবে এই উৎসবে অংশগ্রহণ করেন।

ওঁ বিষ্ণু ওঁ বিষ্ণু ওঁ বিষ্ণু ওঁ তদবিষ্ণুঃ পরমং পদং পশ্যন্তি সুরয়ঃ । দিবীব চক্ষুরাততম ।। ওঁ বিষ্ণু ওঁ বিষ্ণু ওঁ বিষ্ণু ।।

পুস্প শুদ্ধি

ওঁ পুস্পে পুস্পে মহাপুস্পে সুপুস্পে পুস্পে পুস্পসম্ভবে । পুস্পেচয়াবকীরনে ওঁ হুং ফট স্বাহা ।

পুজা মন্ত্র 

এষ গন্ধ ওঁ গণেশায় নমঃ , এতৎ সচন্দন পুষ্পম ওঁ গণেশায় নমঃ , এষ ধুপ ওঁ গণেশায় নমঃ , এষ দীপ ওঁ গণেশায় নমঃ , এতন নৈবেদ্য ওঁ গণেশায় নমঃ । জপঃ ওঁ গণেশায় নমঃ

এষ গন্ধ  ওঁ শ্রী সূর্যায় নমঃ , এতৎ সচন্দনপুস্পম ওঁ শ্রী সূর্যায় নমঃ , এষ ধুপ ওঁ শ্রীসূর্যা নমঃ ,এষ দীপ ওঁ শ্রী সূর্যায় নমঃ , এতন নৈবেদ্যম ওঁ শ্রী সূর্যায় নমঃ ।

সূর্যের ধ্যান

ওঁ রক্তাম্বুজাসনমশেষগুনৈকসিন্ধুং , ভানুং সমস্তজগতামধিপং ভজামি । পদ্মদ্বয়াভয়রবান দধতং করাজৈর  মানিক্যমৌলিমরুণাঙ্গরুচিং ত্রিনেত্রম ।

সূর্য নাম মন্ত্র হল- "ওং ঘৃণি সূর্যায় নমঃ"।

সূর্য বৈদিক মন্ত্র- "ওং আকর্ষেণ রজসা বর্তমানো নিবেশায়নামর্তন মার্তণ্ড
হিরণ্যায়েন সবিতা রথে দেব যাত্রী ভুবানানি পশ্যন"।
সূর্যদেবের নমস্কারের মন্ত্র হল সূর্য প্রণাম মন্ত্র হল - "ওঁ জবাকুসুমসঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম । ধান্তারীং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোহস্মি দিবাকরম্ ।।"

সূর্যদেবের ধ্যান মন্ত্র হল- "ওঁ রক্তাম্বুজাসনমশেষগুণৈসিন্ধুং, ভানুং সমস্তজগতামধিপং ভজামি।
পদ্মদ্বয়াভয়বরান্ দধতং করাব্জৈ- র্মাণিক্যমৌলিমরুণাঙ্গরুচিং ত্রিনেত্রম্।।"

শুক্ল পক্ষের রবিবারে সূর্যদেবের মন্ত্র জপ শুরু করতে হয়। মন্ত্র জপ করার সময় লাল আসনে বসা উচিত। পূজোর সময় ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালাতে হয়। তবে প্রথমে গুরু, গণেশ, বিষ্ণু, শিবের উপাসনা করার পরেই শুরু করুন সূর্য মন্ত্র জপ করতে হয়। এই ভাবে সূর্দেবের উপাসনা করলে দেবতা আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। স্নান সেরে শুদ্ধ বস্ত্রে সূর্যদেবের আরাধনা করা হয়। এক মনে নিষ্ঠা ভরে সূর্যদেবকে ডাকলে, দেবতা তাঁর ভক্তের ডাক শোনেন। এবং শারীরিক ও মানসিক কষ্ট থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

তবে এই সূর্য পূজার ক্ষেত্রে কিছু কিছু বিধি নিষেধ রয়েছে। যেমন- কখনই স্নান না সেরে সূর্য পূজা করা উচিত নয়। সর্বদা তামার পাত্রেই সূর্য পূজা করা উচিত।

পূজার অর্ঘ্যদানের জলে কোনরূপ চিনি বা মিষ্টি জাতীয় জিনিস দেওয়া যাবে না। এর পাশাপাশি এই পবিত্র জল যাতে এক ফোঁটাও পায়ে না পড়ে, সেটাও লক্ষ্য রাখতে হবে। অর্ঘ্যদানের সময় সূর্যদেব মেঘের আড়ালে চলে গেলেও, অর্ঘ্যদানে বিরত হওয়া যাবে না।

ধন, বৈভব, যশের কামনা করে থাকলে রবিবারের দিন প্রত্যক্ষ দেবতা সূর্যের সাধনা করতে ভুলবেন না। এদিন, বিধি অনুযায়ী পুজো ও উপোস করলে সমস্ত বাধা দূর হয় ও সরকারি চাকরি ও ব্যবসায় সাফল্য হাতে আসে।

রবিবার স্নান করে সূর্যকে জলের অর্ঘ্য দেওয়া উচিত। শুধু রবিবারই নয়, রোজ এই অর্ঘ্য দেওয়া উচিত। ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা অনুযায়ী, নিয়মিত জলের অর্ঘ্য দিলে সূর্য খুশি হন।

সূর্য উপাসনায় মন্ত্র জপ করলে মনোকামনা শীঘ্র পুরো হয়। সুখ-সমৃদ্ধি, উন্নত স্বাস্থ্য ও সরকারি চাকরির জন্য সূর্যের মন্ত্র উপযোগী। এই মন্ত্রটি হল—

এহি সূর্য সহস্ত্রাংশো তেজোরাশো জগত্পতে।

অনুকম্পয় মাঁ ভক্ত্যা গৃহণাধ্য্র দিবাকর।।

ওম ঘৃণি সূর্যায় নমঃ।।

ওম এহি সূর্য সহস্ত্রাংশো তেজোরাশো জগত্পতেয় অনুকম্পয়েমাং ভক্ত্যায় গৃহাণার্ধয় দিবাকররু।।

ওম হৃীং ঘৃণিঃ সূর্য আদিত্যঃ ক্লীং ওম।।

সূর্যকে প্রসন্ন করার জন্য রবিবার গুড় দান করা উচিত। এদিন দান করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ব্যক্তি নিজের ইচ্ছানুযায়ী দান করতে পারেন।

কমলা সূর্যের রং। রবিবারের দিন তাই এই রঙের কাপড় পড়া উচিত।