চাণক্য নীতি | শত্রুকে উচিৎ শিক্ষা দিতে, সর্বদা মনে রাখুন চানক্যের এই নীতি

চাণক্য নীতি | শত্রুকে উচিৎ শিক্ষা দিতে, সর্বদা মনে রাখুন চানক্যের এই নীতি

রাজনীতি, কূটনীতি, অর্থনীতি, রাজধর্ম, প্রজা নিয়ন্ত্রণ, শত্রু আক্রমণ ইত্যাদি নানা বিষয়ে নিজের গুরুত্বপূর্ণ মতামত ব্যক্ত করে গিয়েছেন মহাপন্ডিত চাণক্য। তাঁর সুচিন্তিত পরামর্শ এতটাই চিরন্তন এবং আধুনিক যে বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়েও তার প্রয়োগ বুঝতে অসুবিধা হয় না।মানবজীবনে যতজন মিত্র আছে তার থেকে কয়েক গুণ বেশি শত্রুর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয়।

চাণক্য পন্ডিত এটি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন কয়েক হাজার বছর আগেই। তাই চাণক্য নীতি কথা তে তিনি শত্রুর প্রতি আমাদের কি ব্যবহার হওয়া উচিত তা বর্ণনা করেছেন ।  চাণক্য তাঁর অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জানতে পেরেছিলেন যে শত্রু যদি জীবনে থাকে তবে কারও কখনই গাফিলতি করা উচিত নয়। কারণ আপনার অবহেলা শত্রুর জয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াবে। চাণক্য নীতি অনুসারে, মানুষের দুই ধরণের শত্রু রয়েছে, প্রথম দৃশ্যমান শত্রু এবং দ্বিতীয় অদৃশ্য শত্রু।

চাণক্যের মতে শত্রু যেই হোক না কেন, তাকে কখনই হালকা ভাবে নেওয়া উচিত নয়। চাণক্যের মতে শত্রু যদি শক্তিশালী হয় তবে লুকিয়ে থেকেই সেই শত্রুতা শেষ করার চিন্তা করা উচিত। চাণক্যের মতে সর্বদা শত্রুর কার্যকলাপ সম্পর্কে সচেতন এবং জ্ঞান থাকা উচিৎ। এটি করে আপনি শত্রুর প্রতিটি কৌশল জানতে পারবেন এবং আপনি সজাগ থাকবেন। তবে এগুলি ছাড়াও কিছু জিনিস রয়েছে যেই বিষয়গুলিও জেনে রাখা খুব জরুরি। চাণক্যের মতে শত্রুকে কখনই দুর্বল মনে করা উচিত নয়।

শত্রু আপনার দুর্বলতার সুযোগ পেয়ে আক্রমণের সময় খুঁজছেন। অতএব, শত্রুর সামনে কখনই নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করবেন না। দুর্বলতা প্রকাশিত হলে শত্রু সহজে আক্রমণ করার সুযোগ পাবে। চাণক্যের মতে নিজের শক্তি বাড়িয়ে রাখা উচিত, সর্বদা তার শক্তি বৃদ্ধি করার বিষয়ে চিন্তা করা উচিত। যদি কোনও ব্যক্তি উচ্চ পদে থাকে তবে তার শত্রুও রয়েছে, যা তিনি জানেন না। তাই শক্তি বাড়িয়ে রাখলে শত্রুর মনোবল দুর্বল হয়ে যায়। চাণক্যের মতে শত্রুদের সংস্থানগুলি সংরক্ষণ করার সময় ও শত্রুকে পরাজিত করার জন্য একটি পরিকল্পনা করা উচিত। শত্রু যদি ক্ষমতা বেশি থাকে তবে তা লুকিয়ে রাখা উচিত এবং এর শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। সক্ষম এবং উপযুক্ত সময়ে, শত্রুর প্রতিটি পদক্ষেপের কঠোরতার সঙ্গে সাড়া দেওয়া উচিত।

দুর্জন পরিহর্তব্যো বিদ্যয়ালঙ্কৃতোহপি সন্।
মণিনা ভূষিতঃ সর্পঃ কিমসৌ ন ভয়ঙ্করঃ।।

চাণক্য নীতিকথার অনুবাদ: দুর্জন বিদ্বান হলেও যেকোনো মূল্যে তাকে এড়িয়ে চলা কর্তব্য। মনিভূষিত বিষাক্ত সর্প কি অধিক ভয়ঙ্কর নয়?

ঋণ শেষঃ অগ্নিশেষশ্চ ব্যাধিশেষ তথৈব চ।
পুনশ্চ বর্ধতে যস্মাৎ তস্মাৎ শেষম্ চ কার্যেত।।

অগ্নি, শত্রু এবং রোগব্যাধি সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা উচিত, অন্যথায় তা বাড়তেই থাকবে।

নখিনং চ নদীনাং চ শৃঙ্গিনাং শস্ত্রপাণিনং।
বিশ্বাসঃ নৈব কর্তব্যঃ স্ত্রীষু রাজকুলেষু চ।।

নখযুক্ত প্রাণী, নদী, শিংওয়ালা জন্তু, অস্ত্রধারী ব্যক্তি, নারী অথবা রাজনীতিবিদকে কখনোই বিশ্বাস করতে নেই।

সর্পঃ ক্রূরঃ খলঃ ক্রূরঃ সর্পাৎ ক্রূরতরঃ খলঃ।
মনন্ত্রৌষধিবশঃ সর্পঃ খলঃ কেন নিবার্যতে।।

দু’ধরনের হিংসুক প্রাণী আছে; যথা: সাপ এবং সাপের ন্যায় ক্রূর স্বভাববিশিষ্ট মানুষ। এই দুইয়ের মধ্যে সাপের মত ক্রূর স্বভাববিশিষ্ট মানুষ অধিক ভয়ানক। কারণ মন্ত্রের দ্বারা সাপকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও ক্রূর স্বভাবের মানুষকে বশীভূত করা যায় না।

  • দাক্ষিণ্যং স্বজনে দয়া পরজনে শাঠ্যং সদা দুর্জ্জনে।
  • প্রীতি সাধুজনে স্ময়ঃ খলজনে বিদ্বজনে চার্জ্জবম্।
  • শৌর্য্যং শত্রুজনে ক্ষমা গুরুজনে নারীজনে ধূর্ত্ততা।
  • ইত্থং যে পুরুষা কলাসু কুশলাস্তেস্বেব লোকস্থিতি।।

সকলের সাথে সম ব্যবহার করা চলে না, শট এর সাথে শাঠ্যতা, খড়ের সাথে অহংকারে মনোভাব, নারীর সাথে ছলনা, সাধু জনের সাথে সম্প্রীতি, বিদ্বান এর সাথে সারল্য, শত্রুর সাথে বীরত্ব, আপনজনকে দাক্ষিণ্য গুরুজনকে ক্ষমা এবং পরজনকে দয়া করা কাম্য। এরূপ ব্যবহারে মানুষ সংসারে উন্নতি করতে পারে।

তক্ষকস্য বিষং দন্তে মক্ষিকায়া মুখে বিষম্।
বৃশ্চিকস্য বিষং পুচ্ছে সর্ব্বাঙ্গে দুর্জ্জনে বিষম্।।

চাণক্য নীতি শাস্ত্র এর মধ্যে অন্যতম একটি বাণী -সর্পের দন্তে যেমন বিষ থাকে, মাছির মুখে বিষ থাকে, বৃশ্চিকের বিষ থাকে তার লেজে কিন্তু দুষ্টু লোকের সারা দেহে বিষ থাকে, তাই সে বিষধর। সেজন্য সর্বদা দুষ্টু ব্যক্তির সঙ্গ ত্যাগ করা উচিত।

দুষ্টা ভার্যা শঠং মিত্রং ভৃত্যশ্চোত্তরদায়কঃ।
স-সর্পে চ গৃহে বাসো মৃত্যুরেব ন সংশয়ঃ।।

যার স্ত্রী অসতী, বন্ধু প্রতারক এবং ভৃত্য অবাধ্য , গৃহে তার সাপের বাস, অতএব মৃত্যু তার অনিবার্য।  

কৃত প্রতিকৃতিম্ কুরাত হিংসিতে প্রতিহিংসিতে।
তত্র দোষম্ ন পশ্যামি তো দুষ্টে দুষ্টম আচরেত।।

দয়ার জবাব দয়ায়, আক্রমণের জবাব প্রতিআক্রমণের দ্বারা দিলে তাতে কোন দোষ থাকে না। প্রতারকের সাথে ব্যবহারে প্রতারণার আশ্রয় অবশ্যই নিতে হবে।

তুষ্যন্তি ভোজনে বিপ্রাঃ ময়ূরা ঘনগর্জ্জিতে।
সাধবঃ পরসম্পত্বো খলাঃ পরিবিপত্তিষু।।

ব্রাহ্মন ভোজনের দ্বারা তুষ্ট হয়, ময়ূর মেঘ গর্জনে আনন্দে নিত্য করে। সজ্জন ব্যক্তি পরের সুখে সুখী হয়। কিন্তু দুষ্টু বা অসৎ ব্যক্তি পরের দুঃখে ও বিপদে আনন্দ লাভ করে।

অরি- প্রযত্নাম্ অভিসমীক্ষতে।।

শত্রুর প্রতি কোমলতা প্রদর্শন করবেন না। তাকে সর্বদা বিপজ্জনক মনে করুন।

পয়ঃপানং ভুজঙ্গানাং কেবলং বিষবর্ধনম্।
উপদেশো হি মুর্খানাং প্রকোপায় ন শান্তয়ে।।

দুধ পান করার ফলে সাপের শুধু বিষ‌ই বৃদ্ধি পায়। তেমন‌ই মূর্খকে সদুপদেশ দান করলে তারা ক্রুদ্ধ হয়। মানসিক প্রশান্তি লাভ করতে পারে না।

ন কশ্চিৎ কস্যচিন মিত্রম্ ন কশ্চিৎ কস্যচিদ্ রিপুঃ।
কর্ণেন হি জানাতিং মিত্রানি চ রিপুম্ তথাঃ।।

স্বভাবত কেউই আমাদের বন্ধু বা শত্রু নয়। একমাত্র কাজের দ্বারাই মানুষ আমাদের বন্ধু বা শত্রু বলে পরিগণিত হয়।