নিজেদের আবর্জনার স্তূপে চাপা পড়ে যাচ্ছে যে দেশটি

garbage-in-lebanon
আবর্জনা

আজবাংলা লেবাননের সংকটকাল শুরু হয় মূলত ২০১৫ সালের প্রথম দিকে। সেবছর লেবানন সরকার বর্জ্য খালাস বা ডাম্পিং কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে বন্ধ হয়ে যাওয়া ডাম্পিং সাইটগুলোকে সঠিকভাবে প্রতিস্থাপন করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় তাৎক্ষনিকভাবে নতুন কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয় তারা। পুড়িয়ে ফেলার মাধ্যমে বর্জ্য খালাসের ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার এবং এজন্য কিছু চুল্লী আমদানি করার প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। এরপর থেকে শুরু হয় যেখানে সেখানে আবর্জনা ফেলা এবং পোড়ানো। এই ব্যাপারটি এখন এতটাই প্রকট হয়ে উঠেছে যে, রাস্তাঘাটে খোলা স্থানেই প্রতিনিয়ত পোড়ানো হচ্ছে বিপুল পরিমাণ আবর্জনা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ লেবাননের এই সংকটকে ‘জাতীয় স্বাস্থ্য সংকট’ হিসাবে চিহ্নিত করেছে।  ভূমধ্যসাগরের তীর থেকে জায়গাটি মাত্র পাঁচশত মিটার দূরে।

 

সেখানে দাঁড়ালে ডান পাশেই দেখা যায় জাউক মোসবেহ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত ধূসর ধোঁয়ার পুরু মেঘ মুহূর্তেই সাগরের উপর উজ্জ্বল নীলাভ আকাশকে ছেয়ে ফেলছে। আর পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, উপকূলের কিনারায় গড়ে ওঠা জোনিয়া ভ্যালির সুউচ্চ দুটি টাওয়ার। বৈরুতের ঠিক বাইরের দিকে অবস্থিত এই মহানগরটি লেবাননের অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র, যাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল আর রেস্টুরেন্ট। বাম দিকে আছে পর্যটকদের জন্য তৈরি বেশ কিছু রিসোর্ট। এতসব নাগরিক স্থাপনার মাঝে দাঁড়িয়ে আপনি যতটা না প্রমোদ পাবেন, তার চাইতে বেশি বিরক্তই হবেন। কারণ, এসব পর্যটন স্থাপনার পাশাপাশি যেদিকেই তাকাবেন, সেদিকেই দেখবেন আবর্জনা আর আবর্জনা। সমুদ্র সৈকতটি পরিষ্কার করা হয়েছে। এবছরেই ইতোমধ্যে ১৬ বার পরিস্কার করেও এর অবস্থার উন্নতি সম্ভব হয়নি। সারা বিশ্ব যখন সমুদ্র সৈকতে প্লাস্টিক সামগ্রী বা দ্রব্য ব্যবহার নিষিদ্ধ করার কথা ভাবছে, ঠিক এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে লেবাননে। প্রতিদিন লেবাননে উদ্ভূত আবর্জনাগুলো সরাসরি ফেলে দেওয়া হয় সাগরে কিংবা পুঁতে ফেলা হয় উপকূলীয় ভূমিতে। আর এই কাজের কারণে ব্যাহত হচ্ছে উপকূলীয় বাস্তুসংস্থান এবং হুমকির মুখে পড়েছে এখানকার জীববৈচিত্র্য। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একদিকে সরকারের অবহেলা, দুর্নীতি এবং অদূরদর্শিতা; অপরদিকে জীববৈচিত্র্য এবং বাস্তুসংস্থান বিপর্যয়ের ঝুঁকি- এমন উভয় সংকটময় অবস্থায় নিজেদের উৎপাদিত আবর্জনার স্তূপের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে লেবানন।  লেবানন সরকারের এমন অবিবেচকের মতো সিদ্ধান্ত এবং পরিবেশের ভয়াবহ বিপর্যয় দেখে পরিবেশ সংরক্ষণে কাজ করে যাওয়া সংস্থাগুলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কিছু জরুরি সমাধান খুঁজে বের করতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে। ২০১৭ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বের ১৮০ দেশের দুর্নীতি সূচক হিসাব করে সবচেয়ে কম দুর্নীতিপরায়ণ দেশগুলোর একটি ক্রমতালিকা প্রকাশ করে। যেখানে ১৭৫টি দেশের মধ্যে লেবাননের অবস্থান ছিল ১৪৩ তম। অন্যভাবে বলতে গেলে, লেবানন সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিপরায়ণ দেশগুলোর মধ্যে ৩৩ তম অবস্থানে রয়েছে। এভাবে একদিকে সরকারের অপরিপক্ক সিদ্ধান্ত আরেকদিকে দুর্নীতিপরায়ণ মনোভাব, এই দুয়ের মাঝে পড়ে লেবাননের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। প্রথম দিকে যখন লেবাননে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সংকট দেখা দেয়, তখন লেবানীয় নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আন্দোলনও সংগঠিত হয়েছিল। আন্দোলনকারীরা লেবাননের সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় রাস্তায় মিছিল করেছিল এবং সরকারকে ‘দুর্গন্ধময় সরকার’ বলে স্লোগানও দিয়েছিল। ক্রমান্বয়ে এই আন্দোলন আরো বৃহৎ আকার ধারণ করতে থাকে এবং ‘বৈরুত মদীনাতি’ নামে একটি রাজনৈতিক দলেরও উদ্ভব হয়। তারা নিয়মিতভাবে সরকারের বর্জ্য পোড়ানোর চুল্লী কেনার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। পুড়িয়ে বর্জ্য খালাসের ব্যাপারটি লেবানীয়রা যুক্তিযুক্ত মনে করছেন না কারণ, এই পদ্ধতিটি তাদের পরিবেশের সাথে ঠিক মানায় না। ‘রিসাইকেল বৈরুত’ নামক পরিবেশবাদী সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা জোসলিন কেদির ভাষ্যমতে, ভূমধ্যসাগরের সমুদ্র সৈকত ধরে এদিক ওদিক হাঁটাহাঁটি করলেই বোঝা যায়, এই এলাকার লোকজন কতভাবে এলাকাটি দূষিত করছে। ওয়ান টাইম কফি কাপে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। অসংখ্য প্লাস্টিক ব্যাগ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এদিক সেদিক। কফির প্রতি লেবানীয়দের ভালোবাসা অত্যন্ত প্রকট। সেখানে এক কাপ কফি খেয়ে কাপটি ছুঁড়ে ফেলার সাথে সাথেই আপনার হাতে চলে আসতে পারে আরেক কাপ কফি। কিন্তু কেউই ফেলে দেওয়া কাপগুলোর পরবর্তী গন্তব্য নিয়ে ভাবছে না। অথচ পৃথিবীর অনেক দেশই বর্জ্য রিসাইকেলের মাধ্যমে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করে পরিবেশের উন্নতি করেছে, এমনকি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে ব্যবসাও দাঁড়িয়ে গেছে অনেক জায়গায়। এছাড়াও সমুদ্র সৈকতে প্রচুর পরিমাণে প্লাস্টিকের বোতল, খেলনা, ফিল্টার ইত্যাদি পড়ে থাকতে দেখা যায়। আরো বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, বিপুল পরিমাণ মেডিকেল বর্জ্য, গার্মেন্টস কাপড় এবং তেল-চর্বি ফেলা হচ্ছে সাগরের মাঝেই! “তার সংস্থাটির নাম আসলে এক প্রকার ছদ্মনাম। তারা পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি দেশের দুর্নীতি নির্মূলের জন্য একটি সঠিক পথ তৈরি করছেন। কারণ, তিনি এবং তার সংস্থার কর্মীরা বিশ্বাস করেন, সরকারের মধ্য থেকে দুর্নীতি দূর করতে পারলেই এই সংকট স্বয়ংক্রিয়ভাবে দূর হয়ে যাবে।”  এমন কিছু বর্জ্য আছে যা রিসাইকেল করার জন্য ‘রিসাইকেল লেবাননের’ পক্ষ থেকে জিয়াদ আবিচাকার পরিচালিত ‘সিডার এনভাইরনমেন্টাল’ নামক একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংস্থায় পাঠিয়ে দেয়। এর পাশাপাশি সংস্থাটি লেবাননের জৈব বর্জ্যগুলোকে কম্পোস্ট করার জন্য ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি’ তৈরি করেছে এবং তারা যতটা পারা যায়, ফেলে দেওয়া বর্জ্য সংরক্ষণ করে থাকে। জিয়াদ বৈরুত শহরের বিভিন্ন জায়গায় কাঁচের বোতল এবং কাঁচের বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য ডাস্টবিনও স্থাপন করেছেন। এসব ডাস্টবিন থেকে সংগৃহীত বর্জ্যগুলি পরে দক্ষিণ লেবাননের সারাফান্দ নামক একটি ছোট শহরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কাঁচ এবং কাঁচের বর্জ্য গলিয়ে সেগুলো দিয়ে তৈরি জিনিসপত্রের কুটির শিল্প গড়ে উঠেছে। কিন্তু এসব ব্যক্তি এবং বেসরকারি পর্যায়ের উদ্যোগে যেমন সরকারি সহায়তা নেই, তেমনই জনসচেতনতা এবং অর্থের অভাবে এখনো এগুলো সফলতার মুখ দেখে উঠতে পারছে না। ‘রিসাইকেল বৈরুত’ সংস্থাটি বৈরুতের বিভিন্ন হোটেল, রেস্টুরেন্ট এবং স্থানীয় জনগনের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তাদেরকে ডাকলেই তারা এসে বর্জ্য নিয়ে যায় এবং তাদের কারখানায় নিয়ে এসে ভিন্নতা অনুসারে বর্জ্য আলাদা করে এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বর্জ্য সংগ্রহের এই কাজটি এখন লেবাননে আশ্রয় নেওয়া অনেক সিরিয়ান শরণার্থীরা করছে, যা কিনা একই সাথে লেবাননের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শরণার্থী সংকট প্রশমিত করতে পারে। “আমরা আমাদের দেশে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থী এবং সুবিধাবঞ্চিত লেবানীয় নাগরিকদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছি। কিন্তু আসল সমস্যা হচ্ছে, এখানে শরণার্থীরা সহজে ওয়ার্ক পারমিট পাচ্ছে না। যেসব বর্জ্য পরিবহনকারী ট্রাক ড্রাইভাররা শরণার্থী, তারা পথে পুলিশের বাধার মুখে পড়ছে। পুলিশের কাছে একবার ধরা খেলে জরিমানাও আমাদেরকে গুণতে হচ্ছে, পাশাপাশি ট্রাকটিও কয়েকদিনের জন্য পুলিশ বাজেয়াপ্ত করে ফেলে। জরিমানা প্রদান করে ট্রাক ছাড়িয়ে আনতে কয়েক দিন লেগে যায়, ফলে আবারও চারিদিকে আবর্জনার বিশাল স্তূপ জমে যায়। এবং তাৎক্ষনিক বর্জ্য খালাসের জন্য জমে যাওয়া এই বিপুল পরিমাণ উচ্ছিষ্ট সাগরের মধ্যে ফেলা হচ্ছে বা মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হচ্ছে। ফলে বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থাও ঠিক তার নিজ গতিতে চলতে পারছে না।” লেবাননের বর্জ্য সংকট নিয়ে কাজ করছেন আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অফ বৈরুতের (আইইউবি) অ্যানালিটিকাল কেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজাত সালিবা, যিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ সংরক্ষণ সেন্টারের পরিচালক। তার নেতৃত্বে ২০১৫ থেকেই আইইউবি টাস্কফোর্স গঠন করে এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি সহজ সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন, পাশাপাশি সরকারকেও এই ব্যাপারে সহায়তা দান করার জন্য কাজ করছে। ড. নাজাত লেবাননের বাতাসে দূষণের পরিমাণ গবেষণা করেন এবং তার গবেষণা থেকে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, বর্জ্য খালাস এবং পোড়ানোর জায়গার আশেপাশে যারা থাকে, তারা সবচেয়ে বেশি হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এমন অবস্থায় বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলার সরকারি সিদ্ধান্তে তিনিও বিচলিত, কারণ এতে করে নতুন যে সমস্যা উদ্ভব হবে সেটি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বায়ুদূষণ। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, লেবাননে এমন কোনো ল্যাব নেই যা নিশ্চিত করতে পারে যে, বর্জ্য পুড়িয়ে ফেললে তা থেকে নির্গত ধোঁয়া তেমন একটা ক্ষতি করবে না। এবং সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে, লেবাননের জনগণ লেবানীয় সরকারের উপরে এইটুকু আস্থা রাখতে পারছে না যে, তাদের সরকার বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটি পরিচালনার ক্ষেত্রে ইউরোপীয়দের মতো সঠিক গুণগত মান বজায় রাখতে পারবে। লেবাননের বাতাসের গুণগত মান নিয়ে অনুষ্ঠিত একটি কর্মশালায় ড. নাজাতের সহকর্মী একটি ভিডিও প্রতিবেদনের মাধ্যমে দেখান যে, সরকার বর্জ্য পোড়ানোর জন্য যেসব স্থানে চুল্লী স্থাপন করতে চাচ্ছে সেসব স্থানে যদি বর্জ্য পোড়ানো হয়, তাহলে পুরো বৈরুতের জনগণ এসব চুল্লী থেকে নির্গত রাসায়নিক দ্রব্য দ্বারা মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হবে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, লেবাননের এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট কাটতে বছরের পর বছর লেগে যাবে। লেবাননের নির্মল বাতাস ফিরিয়ে আনার জন্য লেবাননের জনগণ, দেশটির প্রবাসী নাগরিকেরা, শরণার্থী সবাই একইসাথে সরকারী নীতির বিপরীতে কাজ করে যাচ্ছেন। ড. নাজাতের কণ্ঠে তবুও আশার ধ্বনি শোনা যায়