অমানবিক অত্যাচারের ফলে পাকিস্তান-বাংলাদেশ-আফগানিস্তান ছাড়ছে হিন্দুরা

প্রভাকর রায়   আজবাংলা   ইসলামি প্রজাতন্ত্র আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মতোই বাংলাদেশেও যে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সে কথা সবার জান। এই তিনটি দেশে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম বলেই সেখানে অমুসলিমদের উপর নির্যাতন ও অমানবিক অত্যাচারের ফলে তাদের দেশ ছারতে বাধ্য করা হছে।একদিন যে সিন্ধু নদীর তীরে শুরু হয়েছিলো আর্যদের আদি সিন্ধু সভ্যতা সেই স্থানটি আজ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত।যদিও পাকিস্তানের সৃষ্টির মূলনীতিতেই দেশটি অমুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য একরকম নিষিদ্ধকরা হয়েছিলো, তবুও ১৯৪৭ এ দেশ ভাগাভাগির সময় অনেক মুসলিম যেমন ভারতেই থেকে গিয়েছিলো, তেমন কিছুহিন্দু তাদের আদি পূর্বপুরুষের জন্মস্থানের মায়ায় পাকিস্থান ত্যাগ করেনি। হয়ত সে সিদ্ধান্তের জন্য তাদের পরের প্রজন্ম হয়ত আজও তাদের অভিশাপ দিয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত কারণ তারাই যে আজ বড় ভিকটিম পাকিস্তান-বাংলাদেশ-আফগানিস্তানের সমাজে। পাকিস্থানে হিন্দুদের প্রকৃত সংখ্যা কত তা জানা কঠিন, কারণ পাকিস্থান সরকার সবসময়ই তা অনেক কম হারে সরকারীভাবে প্রকাশ করে আসছে। সেই তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে বর্তমানে বসবাসরত হিন্দুর সংখ্যা প্রায় অন্তত ৩৩ লক্ষেরও বেশি। যা সে দেশের জনসংখ্যার ১.৬ শতাংশ বলা যেতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটি ১৭ মিলিয়ন বা ১কোটি ৭০ লক্ষ। আফগানিস্তানে এই সংখ্যাটা ১ হাজারের সামান্য কিছু বেশি। কিন্তু এই তিন দেশেই দ্রুত কমছে হিন্দু ধর্মালম্বীদের সংখ্যা। হয় এদের ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে অথবা নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে। এমনকী, এই তিন দেশেই হিন্দু মেয়েদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে করা হচ্ছে ধর্ষণ এবং হত্যাকাণ্ডের মতো ঘৃণ্য কাণ্ড। হিন্দুদের সংখ্যা যাতে না বাড়তে পারে, সেই কারণে আবার হিন্দু মেয়েদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে প্রথমে গণ-ধর্ষণ করা হয় এবং তারপর তাদের মুসলিম ধর্মালম্বীদের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে হিন্দু মেয়েদের ভাগ্য অতটা সুখকর হয় না। এখানে অপহৃত হিন্দু মেয়েদের ভাগ্যে থাকে নিদারুণ পৈশাচিক অত্যাচার, লাগাতার ধর্ষণ এবং একের এক তালিবান পুরুষদের শয্যাসঙ্গিনী হওয়া। পরিশেষে হয় পাথরের বাড়ি বা বন্দুকের গুলিতে প্রাণ বিসর্জন। বাংলাদেশের চট্টগ্রামেও কয়েক বছর আগে এক সম্ভ্রান্ত বনেদি হিন্দু ব্যবসায়ী পরিবারের মেয়ে-কে অপহরণ করা হয়েছিল। সেই পরিবারের যথেষ্ট প্রভাব থাকলেও বাড়ির মেয়েকে উদ্ধারে লেগে গিয়েছিল মাস খানেকেরও বেশি সময়। অভিযোগ, খোদ পুলিশ এসে ওই মেয়ের কথা ভুলে যাওয়ার জন্য চাপ দিত। আপাতত সেই মেয়ে কলকাতা শহরে বসবাস করছে। এই মানুষগুলি ইতিমধ্যেই নিজের ভিটে-মাটি ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। কারণ হিন্দু হিসাবে এঁদের আর কোনও দেশে যাওয়ার রাস্তা নেই।২০১০ সালে, যখন করাচিতে একজন হিন্দু তরুণ একটি মসজিদের নিকটবর্তী জলের ট্যাঁপ থেকে জল পান করার অপরাধে সে এলাকার কমপক্ষে ৬০ জন হিন্দুকে খুন, গুম, ঘরছাড়া যাকে ইংরেজিতে বলে, "Ethnic cleansing" এর স্বীকার হতে হয়। হিন্দুদের উপর এমন ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে পাকিস্তানের আনাচে-কানাচে যার অধিকাংশই আমাদের কানে আসে না। পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তানে এক সময়ে বসবাসকারী এই হিন্দুরা যেভাবে প্রতিনিয়ত জীবনে সংখ্যাগরিষ্ঠদের দ্বারা অত্যাচারের শিকার হয়েছে তাতে এঁরা আর কোনওভাবেই নিজের ভিটে-মাটিতে ফিরতে রাজি নন। তাই ভারতের বুকে দিনের পর দিন ভিসা-র মেয়াদকাল বাড়িয়েও কোনও মতে তাবুতে জীবন কাটিয়ে দেওয়াটাই শ্রেয় বলে মনে করছেন।  পাকিস্তানের মোট হিন্দু জনসংখ্যার ৯৫ ভাগই বাস করে সিন্ধু প্রদেশে, করাচীতে কিছু হিন্দুদের আনাগোনা চোখে পড়ে যদিও পাকিস্তানের রাজনিতিতে তাদের কোন ভুমিকা রাখার সুযোগ নেই। পাকিস্তানের শিক্ষা কারিকুলামেও ভারত ও হিন্দুদের যত সম্ভব নিচু করে উপস্থাপন করা যায় সেভাবেই দেখানো হয়েছে, উচু কোন পর্যায়ে হিন্দুদের কোন উপস্থিতি নেই বললেই চলে, তবু তার মাঝেও পাকিস্তানের কয়েকজন আলোচিত হিন্দু বাক্তিত্ত হচ্ছেন, প্রাক্তন ক্রিকেটার দানিশ কনেরিয়া, আন্তর্জাতিকভাবেপরিচিত ফ্যাশন ডিজাইনার "দিপক পের্বানি" যার তৈরিকৃত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কুর্তা পোশাকটি ঠাই পেয়েছে গ্রিনেচ বুক অফ রেকর্ডস এ, এবং পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সদ্যপ্রয়াত রানা ভগবানদাস। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দরবারে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর মুসলিম মৌলবাদীদের অত্যাচার,নির্যাতনের কাহিনী বলে বাংলাদেশ সরকার ও মুসলিম মৌলবাদীদের রোষানলে পরেন বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু মহিলা প্রিয়া সাহা। আজও প্রিয়া সাহা বাংলাদেশ ছারা।দিল্লির হিন্দু উদ্বাস্তু ক্যাম্পের এক অন্যতম বাসিন্দা মালা দাস। এখন অনেকটা-ই সে আত্মবিশ্বাসী। বিশেষ করে ভারতে চলে আসার পর নিজেকে এখন অনেকটাই ভাগ্যবান বলে মনে করেন তিনি। ২০১১ সালে পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশের হায়দরাবাদ থেকে এসে নয়াদিল্লির এক হিন্দু উদ্বাস্তু ক্যাম্পে আশ্রয় হয়েছিল মালা-র। তাঁর মতে, যখন ভারতে এসেছিলেন তখন পড়াশোনা জানতেন না। লিখতে-পড়তে পারতেন না। কারণ, পাকিস্তানে হিন্দু মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার ব্যপারে প্রবল বাধার সামনে পড়তে হত। এমনকী স্কুলের রাস্তা থেকেও হিন্দু মেয়েদের অপহরণ করে নিয়ে যেত পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনজাতির পুরুষরা। অত্যাচারের আতঙ্কে আর নাকি পড়াশোনা-ই শেখা হয়নি মালার। সেই মালা এখন নিজের ভবিষ্যত নিয়ে সচেতন। ছোটখাটো কাজ করে পরিবারের জন্য আয় করছে। তাঁর মতে, ভারতের নাগরিকত্ব পেয়ে গেলে কাজ-কর্ম এবং অন্যান্য সরকারি সুবিধা আরও বেশি করে মিলবে। এতে পরিবারের জন্য আয় করার সুযোগটা তাঁর কাছে আরও বৃদ্ধি পাবে। সম্প্রতি এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি হিন্দু ধর্মমতের অনুসারীর বসবাস ভারত, নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে। ভারতে প্রায় ৯৭ কোটি (৭৯.৪ শতাংশ) হিন্দু বাস করলেও শতাংশের দিক দিয়ে নেপালে (৮১.৪ শতাংশ) সবচেয়ে বেশি হিন্দুদের বাস। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ নেপালে বাস করে প্রায় ২ কোটি ৪১ লাখ ৭০ হাজার হিন্দু। যা নেপালের মোট জনসংখ্যার ৮১.৪ শতাংশ।  মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্টির সংখ্যা ১ কোটি ২৬ লাখ ৮০ হাজার।  ইন্দোনেশিয়ায় হিন্দু জনগোষ্টির সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি। পাকিস্তানে বাস করে প্রায় ৩৩ লাখ হিন্দু।শ্রীলংকায় বসবাস করে প্রায় ২৮ লাখ হিন্দু অনুসারী। মালয়েশিয়াতে প্রায় ১৭ লাখ ও মিয়ানমারে রয়েছে ৮ লাখ ২০ হাজার।পশ্চিমা বিশ্বের যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে সম্মিলিতভাবে প্রায় ২৬ লাখ ৮০ হাজার হিন্দু অনুসারীর বসবাস, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ লাখ ৯০ হাজার ও যুক্তরাজ্যে ৮ লাখ ৯০ হাজার।