কর্ণ ও অর্জুনের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের বিচারে কে প্রকৃত দানবীর?

কর্ণ ও অর্জুনের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের বিচারে কে প্রকৃত দানবীর?

 

মহাভারতের যুদ্ধের সবচেয়ে শক্তিশালী যোদ্ধা হওয়ার দাবীদার একজনই ,যিনি আপাতদৃষ্টিতে যুদ্ধ না করেও আসলে যুদ্ধটা তিনিই করেছেন— তিনি শ্রীকৃষ্ণ । অর্জুন, ভীম, ভীষ্ম, কর্ণ— এরা প্রত্যেকে যতই বলশালী যোদ্ধা হয়ে থাকুন, এদের সবার ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন কৃষ্ণই । অর্জুনকে কৃষ্ণ একাধিকবার যুদ্ধক্ষেত্রে রক্ষা করেছেন । নাহলে অর্জুনের বিনাশ হওয়াটা খুব অসম্ভব ছিল না । ভীমও কর্ণের হাতে অনেক আগেই মারা পড়তে পারতেন ।

পড়েননি তার একমাত্র কারণ কর্ণ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন যে তিনি অর্জুন ব্যাতিত আর কোনো পান্ডবকে হত্যা করবেন না । এর নেপথ্যে দায়ী সেই কৃষ্ণ যিনি যুদ্ধের প্রাক্কালে কর্ণকে তাঁর প্রকৃত পরিচয় জানিয়ে দেন কারণ কৃষ্ণের স্থির বিশ্বাস ছিল কর্ণ ভাতৃহত্যা করবেন না । তেমনি ভীষ্মকে বধ করতে হলে যে তাঁর কাছেই সেই বধের উপায় জেনে নেওয়া ছাড়া গতি নেই তাও কৃষ্ণ বিলক্ষণ জানতেন, এই কারণেই তিনি যুদ্ধ শুরুর আগে একবার স্বয়ং এবং পরে যুধিষ্ঠিরকে নিয়ে তাঁর কাছে যান ।

আর কর্ণ যে অর্জুনের সঙ্গে দ্বৈরথে জয়ী হবেন না তা মোটামুটি নির্ধারিত হয়ে যায় কৃষ্ণ ঘটোৎকচকে যুদ্ধে যেতে বলা ও কর্ণের হাতে তাঁর মৃত্যুর পরই; ইন্দ্রের কাছ থেকে পাওয়া যে একাঘ্নি বাণ তিনি অর্জুনের উপরে প্রয়োগের জন্য তুলে রেখেছিলেন, কৃষ্ণ সেই বাণ তাকে ঘটোৎকচের উপর প্রয়োগ করতে বাধ্য করেন, যার ফলে সেই বাণের ক্ষমতা নিঃশেষিত হয়ে যায় । আর কর্ণকে মাটিতে বসে যাওয়া রথের চাকা তোলবার সুযোগে হত্যা করতে যে কৃষ্ণই অর্জুনকে প্রবুদ্ধ করেছিলেন তা সকলেরই জানা ।

তবে শ্রীকৃষ্ণের বিচারে কর্ণ ও অর্জুনের মধ্যে কে প্রকৃত দানবীর? নিজের নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও যিনি প্রাণরক্ষাকারী কবচ-কুণ্ডল দান করতে দ্বিধা করেননি, তিনি হলেন কর্ণ। দাতা কর্ণ হিসেবেই তিনি বেশী পরিচিত। সমগ্র মহাভারত খুঁজেও এমন দানবীর আর দেখতে পাওয়া যায়না। কর্ণকে দানবীর আখ্যা দেয়ায় একবার অর্জুন বেশ ক্ষুব্ধ হন। তিনি পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞেস করেন, কেন শুধুমাত্র কর্ণকেই দাতা হিসেবে মহিমান্বিত করা হয়। তিনি নিজেও যে গরীব-দুঃখীকে দান করেন, সে কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। 

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তখন অর্জুনকে একটি স্বর্ণের পাহাড়ে নিয়ে যান। তারপর অর্জুনকে বলেন, হে অর্জুন, এই স্বর্ণসমৃদ্ধ পাহাড়ের সকল স্বর্ণ সমস্ত গ্রামবাসীদের মধ্যে ভাগ করে দাও। খেয়াল রাখবে যেন একটি স্বর্ণও অবশিষ্ট না থাকে। অর্জুন তখন পার্শ্ববর্তী গ্রামে গিয়ে সবাইকে জানালেন, তিনি স্বর্ণ বিলি-বন্টন করবেন। অর্জুনের ঘোষণা শুনে সবাই সেই পাহাড়ের সামনে এসে উপস্থিত হলো। দুদিন ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে তিনি স্বর্ণ বিলি করলেন। কিন্তু তখনও তিনি পাহাড়ের বেশীরভাগ খুঁড়ে উঠতে পারেননি।

অথচ গ্রামবাসী তখনও অপেক্ষা করে আছে। ক্লান্ত-বিধ্বস্ত অর্জুন কৃষ্ণকে বললেন, হে কৃষ্ণ, বিশ্রাম না করে আমি আর পারছিনা। পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ তখন কর্ণকে ডেকে পাঠান। কর্ণকেও একটি স্বর্ণের পাহাড় দেখিয়ে তিনি গ্রামবাসীদের মধ্যে স্বর্ণ বিলি করতে বলেন। কর্ণ বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে গ্রামবাসীদের বললেন, এই স্বর্ণের পাহাড়টা আপনাদের।

তারপর তিনি সেখান থেকে চলে যান। হতভম্ব অর্জুন ভাবতে থাকেন যে তাঁর মাথায় কেন এমন চিন্তা এল না। তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বলেন, এজন্যই কর্ণ দানবীর। অর্জুন স্বর্ণ বিলি করেছেন কিন্তু কাকে কতোটা দেবেন সেই সিদ্ধান্ত নিজের হাতে রেখেছেন। স্বর্ণ বন্টনের সময় গ্রামবাসীর জয়ধ্বনিতে আত্ম-তৃপ্তি লাভ করেছেন। কিন্তু দাতা কর্ণ কোনও কিছুর প্রত্যাশা না করেই সম্পূর্ণ ভাবে দান করতে পারেন। তাঁর দানের পেছনে প্রতিদানে কিছু পাওয়ার কোনওরকম প্রত্যাশা থাকে না। সেই কারণেই তিনি দানবীর।