বদ্রীনাথ ধাম ভগবান বিষ্ণুর মনমুগ্ধকর মন্দিরের ইতিহাস

বদ্রীনাথ ধাম  ভগবান বিষ্ণুর মনমুগ্ধকর মন্দিরের ইতিহাস

আজবাংলা       তীর্থ মাহাত্ম্যের দিক থেকে বদ্রীনাথ সর্বশ্রেষ্ঠ। চারিধামের অন্যতম এই বদ্রীনাথ। বদ্রীনাথ মন্দির হল ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের বদ্রীনাথ শহরে অবস্থিত একটি হিন্দু মন্দির। এই মন্দিরের অপর নাম বদ্রীনারায়ণ মন্দির। এটি হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর মন্দির।  বদ্রীনাথ শহর ও বদ্রীনারায়ণ মন্দির ‘চারধাম’ ও ‘ছোটো চারধাম’ নামে পরিচিত তীর্থগুলির অন্যতম। 

কালো পাথরের তৈরি ভগবান বিষ্ণুর মূর্তি এখানে পদ্মাসনের ভঙ্গিতে আসিন। মন্দিরের সামনে দিয়ে বয়ে গিয়েছে অলকানন্দা ও পাশেই তপ্তকুণ্ড পঞ্চশীলা। অর্থাত্‍ নারদ, নৃসিংহ, বরাহ, গরুড়, ও মার্কণ্ডের এবং পঞ্চতীর্থ, যথা ঋষিগঙ্গা, কুর্মধারা, নারদকুণ্ড, প্রহলাদকুণ্ড ও তপ্তকুণ্ড মূল মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে। মন্দিরটি ১৫ মিটার উঁচু। বদ্রীনাথ মন্দির ‘দিব্য দেশম’ নামে পরিচিত ১০৮টি বৈষ্ণব তীর্থেরও একটি। প্রতি বছর এপ্রিল মাসের শেষভাগ থেকে নভেম্বর মাসের প্রথম ভাগ পর্যন্ত ছয় মাস এই মন্দিরটি খোলা থাকে। শীতকালে হিমালয় অঞ্চলের তীব্র প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্য ওই সময় এই মন্দির বন্ধ রাখা হয়। অন্যান্য সময় বহুভক্তসমাগম থাকে বদ্রীনাথ মন্দিরে। অগন্য তীর্থযাত্রী ছাড়াও নিছক প্রকৃতির রূপসুধা নিরীক্ষণ করতেও বহু মানুষ বদ্রীনাথে আসেন।

এই মন্দিরের প্রধান দেবতা বিষ্ণু ‘বদ্রীনারায়ণ’ নামে পূজিত হন। বদ্রীনারায়ণের ১ মি (৩.৩ ফু) উচ্চতার বিগ্রহটি কষ্টিপাথরে নির্মিত। হিন্দুরা বিশ্বাস করেন, এটি বিষ্ণুর আটটি ‘স্বয়ং ব্যক্ত ক্ষেত্র’ স্বয়ং-নির্মিত বিগ্রহের একটি। বদ্রীনাথ মন্দিরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসবটি হল ‘মাতা মূর্তি কা মেলা’। গঙ্গার পৃথিবীতে অবতরণকে স্মরণ করে এই উৎসব পালন করা হয়। কোনো ঐতিহাসিক নথিতে বদ্রীনাথ মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে বৈদিক ধর্মগ্রন্থগুলিতে এই মন্দিরের প্রধান দেবতা বদ্রীনাথের উল্লেখ পাওয়া যায়।

তার থেকে অনুমান করা হয় যে বৈদিক যুগে (খ্রিস্টপূর্ব ১৭০০-৫০০ অব্দ) এই মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল। কয়েকটি উপাখ্যান অনুসারে, এই মন্দিরটি খ্রিস্টীয় ৮ম শতাব্দী পর্যন্ত একটি বৌদ্ধ ধর্মক্ষেত্র ছিল। ৯ম শতাব্দীতে আদি শঙ্কর এটিকে একটি হিন্দু মন্দিরে রূপান্তরিত করেন।বদ্রীনাথের সিংহাসনটি প্রধান দেবতার নামাঙ্কিত। ভক্তেরা মন্দিরে যাওয়ার আগে রাজার কাছে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতেন। ১৯শ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত এই প্রথা চালু ছিল। ১৬শ শতাব্দীতে গাড়ওয়ালের রাজা বদ্রীনাথের মূর্তিটি বর্তমান মন্দিরে সরিয়ে আনেন। গাড়ওয়াল রাজ্য দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেলে বদ্রীনাথ মন্দির ব্রিটিশদের অধীনে আসে। তবে গাড়ওয়ালের রাজা মন্দিরের ম্যানেজমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান রয়ে যান।

বদ্রীনাথ মন্দিরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসবটি হল ‘মাতা মূর্তি কা মেলা’। গঙ্গার পৃথিবীর অবতরণকে উপলক্ষ করে এই উৎসব আয়োজিত হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, বদ্রীনাথের মা গঙ্গাকে পৃথিবীর জনসাধারণের কল্যাণের জন্য বারোটি শাখায় ভাগ করে দিয়েছিলেন। তারই সম্মানে এই উৎসব পালিত হয়। যে স্থানে এই নদী প্রবাহিত হয়েছিল, তাই পবিত্র বদ্রীনাথ ভূমি নামে পরিচিত হয়।

বদ্রীনাথ মন্দিরটি উত্তর ভারতের অবস্থিত হলেও, এই মন্দিরের প্রধান পুরোহিত বা রাওয়ালরা সাধারণত দক্ষিণ ভারতের কেরল রাজ্যের নাম্বুদিরি ব্রাহ্মণ গোষ্ঠীর মধ্যে থেকে নির্বাচিত হন। লোক বিশ্বাস অনুসারে, এই প্রথা চালু করেছিলেন দক্ষিণ ভারতীয় দার্শনিক আদি শঙ্কর। ২০১২ সালে মন্দির কর্তৃপক্ষ দর্শনার্থীদের জন্য টোকেন ব্যবস্থা চালু করে। দর্শনের সময়-জ্ঞাপক এই টোকেনগুলি ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের তিনটি স্টল থেকে পাওয়া যায়। প্রত্যেক ভক্ত ১০-২০ সেকেন্ড বদ্রীনাথকে দর্শন করার জন্য সময় পান। পরিচয়ের প্রমাণ দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়।