বর্গভীমা শক্তিপীঠঃ ৫১ সতীপীঠের অন্যতম পীঠ তমলুকের বর্গভীমা শক্তিপীঠ

বর্গভীমা শক্তিপীঠঃ  ৫১ সতীপীঠের অন্যতম পীঠ তমলুকের বর্গভীমা শক্তিপীঠ

আজবাংলা        পূর্ব মেদিনীপুর জেলা সদর ঐতিহাসিক তাম্রলিপ্ত বা তমলুকের  আজও মধ্যমণি মা বর্গভীমা | ৫১ সতীপীঠের অন্যতম পীঠ তমলুকের বর্গভীমা। কথিত আছে এই মন্দিরে সতীর বাম গোড়ালি পড়েছিল | বর্গভীমা মা এখানে নানা রূপে পূজিত হয়ে আসছেন |  করালবদনাং মুক্তকেশী, মুণ্ডমালা বিভূষিতাম |  শক্তিপীঠ এর প্রাচীন নাম বিভাস। দেবী এখানে বর্গভীমা বা ভীমরূপা নামে অধিষ্ঠিত। ভৈরব সর্বানন্দ মতান্তরে কপালি। মহামায়া সতীর দেহাংশের মধ্যে বামগুল্ফ বা বাম পায়ের গোড়ালি পড়েছিল এখানে।

কয়েক হাজার বছর ধরে শক্তি স্বরূপিণী আদ্যাশক্তি মহামায়া রূপে দেবী বর্গভীমার আরাধনা চলে আসছে |তবে প্রাচীন এই মন্দিরের বয়স কত তা অনুমান করা বেশ মুশকিল | মতান্তরে তিনি ভীমরূপা বা ভৈরব কপালী নামেও পরিচিত |পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুকের বর্গভীমা মন্দিরের অন্ধকার থেকে উঠে আসছে এক অজানা ইতিহাস |  মাকে প্রতিনিয়ত ভক্তিভরে স্মরণ করা হয় এখানে | পুরাণে কথিত আছে, বিষ্ণুর সুদর্শনচক্রে খণ্ডিত সতীদেহের বাম গোড়ালি পড়ে এখানে | একান্ন পীঠের প্রথম পীঠ এটি | 

গর্ভগৃহে যে বর্গভীমা মূর্তি, তিনি চতুর্ভুজা। ডানদিকে ওপরের হাতে খড়্গ, নিচের হাতে ত্রিশূল। বাঁদিকে ওপরের হাতে খর্পর আর নিচের হাতে নরমুণ্ড। মাতৃকা শবাসনা। ধ্যানমন্ত্র এরকম: দেবী এখানে বর্গভীমা বা ভীমরূপা নামে অধিষ্ঠিত। ভৈরব সর্বানন্দ মতান্তরে কপালি। মহামায়া সতীর দেহাংশের মধ্যে বামগুল্ফ বা বাম পায়ের গোড়ালি পড়েছিল এখানে । ১৪৬৬ খ্রিস্টাব্দে মুকুন্দ রামের চন্ডীমঙ্গল কাব্যে গোকুলে গোমতী নামা তাম্রলিপ্তে 'বর্গভীমা'এবং মার্কণ্ডেয় পুরাণে আছে দেবী বর্গভীমা উল্লেখ।ঠিক কত বছর আগে এই মন্দিরটি তৈরী হয়েছিল তার সঠিক তারিখ কেউ না বলতে পারলেও কথায় রয়েছে কুরুক্ষেত্রের ঘটনার সময় এই মন্দিরের স্থাপন।  

 

এটাও প্রচলন আছে যে অর্জুনের অশ্বও থামিয়ে ছিলেন এই তাম্রধ্যয রাজা । যাই হোক আজ থেকে ষাট সত্তর বছর আগেও এই তমলুক এলাকাতে মা বর্গভীমার পূজো ছাড়া আর কোনো দেব দেবীর পুজো হতো না। এখন মন্ডপে মন্ডপে মায়ের পুজো হলেও, এখানে নিয়ম রয়েছে বাড়ির পুজো হোক বা ক্লাবের,  আগে মা বর্গভীমাকে পুজো দিয়েই অন্য সব জায়গায় পুজোপাঠ শুরু হয়। আজও সেই নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন তমলুকের মানুষ। শ্যামা পুজো দিন এক প্রকার সারা রাত ধরে চলে মায়ের পুজো। তমলুকের বিভিন্ন ক্লাব প্রতিষ্ঠান বা যাদের বাড়ির পুজো সবাই ঘট নিয়ে শোভাযাত্রা সহকারে নাচ গান বাজনার সাথে মা বর্গভীমা মন্দিরে আসেন,  পুজো দেন এরপর নিজের নিজের এলাকায় গিয়ে শ্যামা পুজোয় মেতে ওঠেন। 

কথিত আছে, দেবী বর্গভীমার মন্দিরটি নির্মাণ করেন স্বয়ং বিশ্বকর্মা | তবে, তমলুকের মানুষের বিশ্বাস, ময়ূরবংশীয় রাজাই তৈরি করেন এই মন্দির | মা বর্গভীমা তাম্রলিপ্ত বন্দর নগরীর অধিষ্ঠাত্রী কালিকাদেবী | সন্তান যখন প্রাণভরে মায়ের কাছে কিছু চায় মা নাকি তাকে কখনো ফেরান না | বর্গভীমার মন্দির সারা বছর প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে | সেই সময় মায়ের কাছে পুজো দেওয়া হয় | রাতে অন্নভোগ নিবেদনের পর দেবীর নিদ্রার ব্যবস্থা করা হয় | মা এখানে ভিন্ন ভিন্ন রূপে পূজিতা হন | 

কখনও দুর্গা, কখনও কালী, কখনও জগদ্ধাত্রী। তবে, যেহেতু মন্দিরের মা কালিকারূপী, তাই শ্যামাপুজোয় ভক্তিরস আলাদা মাত্রা পায় | ৩০ ফুট বেদির ওপর ৬০ ফুট উচ্চতার বৌদ্ধ স্থাপত্য ধাঁচে নির্মিত মন্দিরটি | পরবর্তীতে জেলায় শক্তিপুজোর চল শুরু হয় | এখনও সমস্ত শক্তিপুজো শুরুর অনুমতি নিতে হয় দেবী বর্গভীমার কাছ থেকে |ভক্তরাও মাকে মিষ্টি ভোগের পাশাপাশি মনোবাঞ্ছা পূরণে তাল, ওল, কচু এবং শোল মাছ নিয়ে মন্দিরে হাজির হন | ভিন ধর্মের মানুষজনও আসেন এই মন্দিরে | অন্নভোগে নানা ব্যঞ্জনের পাশাপাশি এখনও রোজ মাকে নিবেদন করা হয় শোল মাছের ঝোল |