ভালবাসার দিনে ভালবাসা জেগে থাকুক, দিন দিন প্রতি দিন

ভেলেনটাইন ডে
ভেলেনটাইন ডে
জের্মস বম
-মাথাটা ভন ভন করছে-ঘুরছে।
-কেন?গত রাতে ঘুম ভাল হয়নি!
-গত রাতে তুমি আমার পাশে ছিলে না?
-ছিলামতো!
অবাক হয়ে দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।এরপর কর্তী ফ্লোরে বসা তার ভ্যালেন্টাইল কার্ডে নাম লিখতে ব্যাস্ত।কর্তা তার শোবার খাটে শুয়ে মনোযোগ গল্পের বইয়ের পাতায় পাতায়।এর মাঝে কথা চলে বিচ্ছিন্ন ভাবে।হঠাৎ কর্তার সমুচ্চোরে হাসি এলো।হাসির অবস্থা এমন যে মুখ চেপেও হাসি আর থামাতে পারছেন না।কর্তীর মেজাজ খিটখিটের দিকে ধাপবান।
-কি ব্যাপার এতো হাসছো কেন?
তবুও তার হাসি থামছে না।আবারো কর্তীর জিজ্ঞাসা।
-এ ভাবে কেউ হাসে?আস্তে হাসোনা!লোকেতো তোমাকে পাগল বলবে।এতো রাতে কেউ এভাবে হাসে?
এবার হাসিটা যেন আরো বেড়ে গেল।কর্তীর মেজাজ এবার চরমে।বাধ্য হয়ে বসা হতে উঠে কর্তার হাত হতে বইটা হঠাৎ সরিয়ে আবারো প্রশ্ন।
-তুমি এভাবে হাসছো কেন?বললাম ভ্যালেন্টাইন ডে এর কার্ড সাজাতেঁ একটু হেল্প করো,করলে না।বললে এ সব না জায়েজ কাজ।বলি-ভালবাসা আবার নাজায়েজ হয় কি করে?আবার খিল খিলিয়ে হাসছো আমার কার্ডে লেখা কবিতা লেখার মনযোগ নষ্ট করছো।
এখনো সে হেসেই চলছে।।
-এই ভাল হবে না কিন্তু?আমাকে নিয়ে এ ভাবে মজা করো না।
বলেই কর্তীর সস্তা চোখের জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে।কর্তার মনে অনুশোচনা এলো।এতোটা অভিনয় না করলেও পারতেন।কর্তী যখন তার বাক ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছেন তখনি কর্তার হাতে তার চুড়ি ভর্তি হাতটি ধরা পড়ল।হঠাৎ শক্ত করে হাতটি ধরাতে কয়েকটি চুড়িঁ ভেঙ্গে গেল।হাতটি টান দিয়ে কর্তীকে তার খাটে পাশে বসালেন।তখনো কর্তীর অভিমান ভাঙ্গেনি।মুখ ফিরিয়ে মুখ রাখলেন কর্তার বিপরীত মুখী।
– শোন রাগ করো না।আমি এই জন্য হাসছিলাম তুমি যে ভ্যালেন্টাইন নিয়ে এতো কষ্ট করছ অথচ তুমিতো জানোই না এ উৎসবটা কি ভাবে এলো।কি ঠিক না।
কর্তী এখনো রেগে আছেন আগের সেই বিপরীত মুখী অবস্থানে বসা।।
-একটু মুখটা আমার দিকে ফেরাও।
-না,কি বলবে বলো?
-মুখ না ফেরালে বলার মজা থাকে না।তাছাড়া রাত পোহালেইতো তোমার প্রিয় ভ্যালেন্টাইন ডে শুরু তাই ভালবাসা এখন থেকে শুরু না হলে কালকের পুরো ভ্যালেন্টাইন ডেটাই তোমার বৃথা যাবে।ভালবাসার মানুষটিকে দূরে রেখে কি তোমার ভালবাসা দিবস দিনটা শুভ হবে বলো?আচ্ছা ঠিক আছে আর এমন করে হাসবো না,তবে এর কারনটাতো শুনবে নাকি?
-এই সব ভালবাসা দিবস বলে আমাদের দেশে কোন কালেই ছিলো না।ভালবাসা কোন দিবস দিয়ে হয় না।ভালবাসা সব দিনের জন্যই থাকতে হয়।আমি বহু বই অনলাইন বই ঘাটলাম কোথাও এর সঠিক উৎপত্তি খুজেঁ পেলাম না।এক এক জন এক এক ভাবে এর ব্যাখা দিয়েছেন তবে একটা লেখায় ভরসা পাই আর তা হল-প্রাচীন রোমানদের ধর্ম ছিল প্যাগান ধর্ম এবং তারা বিভিন্ন দেব দেবতাদের পুজাঁ করতেন।লুপারকাস ছিল তাদের বন্য পশুর দেবতা। এই দেবতার প্রতি ভালবাসা জানিয়ে তারা ‘লুপারক্যালিয়া’নামক তখন পুজা উৎসব করত।এই ‘লুপারক্যালিয়া’ উৎসব আগে ফেব্রুয়া ফেব্রুয়া  নামে পরিচিত ছিল,যেখান থেকে এই ফেব্রুয়ারী মাসের উৎপত্তি।রোমানরা এই ‘লুপারক্যালিয়া’ পুজার উৎসবযথা ক্রমে ১৩,১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারিতে পালন করতেন যার মূল দিনটি ছিলো এই ভালবাসা নামক ১৪ ফেব্রুয়ারী।

আর এই পুজার প্রধান আকর্ষণ ছিলো লটারি।বিনোদন এবং আনন্দের জন্য যুবকদের মাঝে যুবতীদের বণ্টন করে দেয়াই ছিল এ লটারির মুল লক্ষ্য।পরবর্তী বছর আবার লটারি না হওয়া পর্যন্ত যুবকেরা তাদের জন্য বরাদ্দ মেয়েদের ভোগ করার এ সুযোগটি পেতেন।এই ‘লুপারক্যালিয়া’র দিনে আরেকটি প্রথা ছিল তা হল-উৎসর্গিত ছাগল ও কুকুরের রক্ত গায়ে মেখে চামড়ার পোশাক পরে দুই যুবক দুটি  চামড়ার চাবুক দিয়ে যুবতীদের প্রহার করতেন।এতে যুবতীদের গর্ভধারণ করতে ক্ষমতা বাড়বে বলে তাতের বিশ্বাস করা হতো।রোমান শাসকেরা এক সময় তাদের প্যাগান ধর্ম পরিবর্তন করে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহন করে।কিন্তু তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য জন গনের প্যাগান সংস্কৃতি ঠিক রেখে তা খ্রিস্ট ধর্মের ব্যানারে নিয়ে যায়।যেমন সানডে তে রোমান প্যাগানরা তাদের সান গড এর পুজা করতেন।খ্রিষ্টান হওয়ার পর তারা সানডে কেই তাদের খ্রিষ্টান ধর্মের উপসনার দিন বানিয়ে নিলেন।

যাই হোক,জনগনের মাঝ থেকে প্যাগান ধর্মের চিহ্ন মুছে ফেলতে গেলাসিয়াস নামের এক খ্রিষ্টান পোপ এবার রোমান গড লুপারকাস এর বদলে খ্রিষ্টান পাদ্রী সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন এর নামে ১৪ ফেব্রুয়ারীকে ভ্যালেন্টাইন ডে ঘোষণা করেন।তখন প্যাগানদের লুপারক্যালিয়াই রূপান্তর হয় খ্রিস্টানদের‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ তে।কিন্তু লটারি পদ্ধতিটা সেই সময়েও চালু ছিল।

কিন্তু মধ্য যুগে এসে লটারি নিয়ে ঝামেলা ও গণ্ডগোল তৈরি হওয়ায় ফরাসি সরকার ভ্যালেন্টাইন দিবস উদযাপন নিষিদ্ধ করে দেয়।পরে ইতালি,অস্ট্রিয়া,হাঙ্গেরি ও জার্মানিতেও এটা নিষিদ্ধ হয়।এমনকি ইংল্যান্ডেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।কিন্তু ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দে রাজা দ্বিতীয় চার্লস আবার এটি পালনের প্রথা চালু করেন।পরবর্তীতে ব্যবসায়িক স্বার্থে বিভিন্ন দেশে এই দিবসটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়।কারণ একেকটি দিবস মানেই মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিদের বড় রকমের ব্যবসা।

সুতরাং মুলত এই ভালবাসা দিবস হল একটি পুজাঁর দিন যে দিন যুবকদের মাঝে লটারি করে ভোগের জন্য যুবতীদের দেওয়া হত।সকল ইসলামিক স্কলার এক মত এই দিনটা মুসলমানদের জন্য উদযাপন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।এমন কি খ্রিষ্টানদের মতেও এটা পালনকরা  নিষেধ ছিল।কি বুঝলে?কিছুই বুঝো নাই।আর আমাদের দেশে এ উৎসব কি ভাবে এতো প্রচল হল শুনবে।
-না না যা বলেছো তা যদি সত্যি হয় তবে এ উৎসব পালন না করাই ভালো।তবে আমি শুনেছি ভ্যালেন্টাইন নামক এক প্রেমিক যুবক প্রেমের জন্য বলিদান হয়।
– হুম কথিত আছে..রোমের সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস সৈনিকদের মাঝে লক্ষ্য করলেন যে বিবাহিত যুবকদের তুলনায় অবিবাহিত যুবকরা যুদ্ধের কঠিনতম মুহূর্তে খুব ধৈর্য্যরে পরিচয় দেয়।অনেক সময় বিবাহিত যোদ্ধারা স্ত্রী-পুত্রের টানে যুদ্ধে যেতেও অস্বীকৃতি জানায়।তাই যুগল বন্দী তথা যে কোনো পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন তিনি।কিন্তু “সেন্ট ভেলেনটাইন” নামের এক প্রার্দী এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে গোপনে তার গির্জায় পরিণয় প্রথা চালু করেন তখন এ খবর জানা জানি হলে সম্রাট তাকে মৃত্যুদন্ড দেন।এরপর থেকে নাকি ভ্যালেনটাইন ডের সুত্রপাত।
আরো আছে..সেন্ট ভেলেন্টাইন-খ্র্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর দিকে এক জন খ্রিশ্চিয়ান ধর্ম প্রচারক ছিলেন।রোমের তৎকালিন সম্রাট  রোমান দেব-দেবীর পূজায় বিশ্বাসী ছিলেন।সম্রাট খ্রিশ্চিয়ান ধর্ম প্রচারের জন্যই তাকে জেলে বন্দী করেন।জেলের ভেতর তার সাথে পরিচয় ঘটে এক মেয়ের সাথে,যে মেয়ে ছিলো জেলার এর মেয়ে। সে প্রায়ই কারারুদ্ধ অবস্হায় তাকে দেখতে আসতো।এ ভাবে ভেলেনটাইন তার প্রেমে পড়ে যায় এবং মৃত্যুর আগে মেয়েটিকে লেখা এক চিঠিতে সে জানায় তার ভালবাসার কথা এবং চিঠিটির নিচে লেখা ছিল ইতি তোমার ভ্যালেনটাইন।এরপর থেকে নাকি ভ্যালেনটাইন ডের সুত্রপাত।
আর এ ভেলেনটাইন ডে নামক  উৎসবটি আমাদের দেশে কবে থেকে বেশী প্রচার হয় জানো?জানো না..অথচ ভেলেনটাইন ডে পালনে উঠে পড়ে লেগেছো।তবে শুন সম্ভবত ১৯৯১ সাল এ -বাংলাদেশের একটি পত্রিকা ও ম্যাগাজিন “যায় যায় দিন” নামে ছিলো।সে সময় বিটিভিতে “লাল গোলাপ” নামক একটি টক শোও হত।যার সম্পাদক ছিলেন শফিক রেহমান।যিনি বাংলাদেশের এই ভালোবাসা দিবসের জনক।সেই ম্যাগাজিন বা পত্রিকায় ছাপা হয় এ ভেলেনটাইন দিবসের কথা।এমনকি লাল গোলাপ টক শোতেও এ সম্পর্কে প্রচারিত হয় সচিত্র প্রতিবেদন।সেই বছর বই মেলায় লাল গোলাপ ষ্টলকে সাজানোঁ হয়েছিল পুরো লাল গোলাপ আর ভেলেটাইনের আদঁলে।যিনি ঐ স্টলে যেতেন তাকেই একটি করে লাল গোলাপ ফ্রি উপহার দিয়ে ভেলেনটাইন ডে কে স্বাগত জানাতেন।তখন হতেই দেশের পার্ক, রেস্তোরাঁ, ভার্সিটির করিডোর, টিএসসি,ওয়াটার ফ্রন্ট,ঢাবির চারু কলার বকুল তলা,তাল তলা,বেল তলা- সর্বত্রো থাকে প্রেমিক-প্রেমিকাদের তুমুল ভিড়।‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ডে’নাম করে অনেক তরুন তরুনী ভালবাসার দ্বীপকুঞ্জে হারিয়ে যায় অবৈধ মেলা মেশায় যা আমাদের দেশের কৃষ্টি কালচারের বিপরীত।প্রাশ্চাত্যের জীবন ধারণের চিত্র আর আমাদের দেশের জীবন ধারণের প্রেক্ষাপট এক নয়।ওরা উলঙ্গ হতে এক সেকেন্ডও দেরী করে না যা আমাদের পক্ষে অসম্ভব।ওরা বিয়ে সাদীর তখনি বন্ধনে জড়ান যতক্ষণ বা যতদিন না বাচ্চা পয়দা হওয়ার আলামত চোখে না পড়ে।

-আমাদের দেশে এ মাসেই উৎসব হয় পহেলা ফাগুন।এ ছাড়াও ১৪ ফেব্রুয়ারী ছিলো স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস,দেখোতো এ সবে কোন নোংরামী আছে কি না?ঐ সব ভেলেনটাইন ডে মানে ছেলে মেয়েদের অবৈধ মেলামেশার লাইসেন্স দেয়া তা কি ঠিক?ভালবাসাকে নিদিষ্ট একটি দিনে বন্দী না করে ভালবাসো প্রতি দিন-কি ছেলে মেয়ে-কি মা বাবা-কি পাড়া প্রতিবেশীদের।আমার কাছে এই এ সব উৎসবের দিন মনে হয় অবক্ষয়ের দিন।আরো একটি কথা হল-যেহেতু এ দিবসটি ভেলেনটাইন নামক একজন ব্যাক্তি বিশেষ এর নামে হয় সেখানে সর্বোত্র ভালবাসা দিবস নাম করণ হয় কি করে?যেখানে যার সঠিক কোন নির্ভর যোগ্য তথ্য নেই।এ সব ব্যাবসায়িক ধান্দাবাজী।

এবার কর্তীর গোমড়া মুখ কিছুটা ফর্সা হল।তারা দু’জনে এবার মুখোমুখি বসলেন।কর্তী এ সব শুনে মনে মনে ভাবলেন সে অনেক লাকী।তার স্বামীটা কত বুদ্ধিমান।শুধু রোজগারের বেলায় নাই।একটূ সোহাগ করে বললেন।
-হেগো,তুমি দেখছি কত বুদ্ধিমান।তুমি এতো কিছু জানো কি করে?
-কচু বুদ্ধিমান!এই যে,এই সব বই পড়ো।দেখবে তুমিও বুদ্ধিমান হয়ে যাবে।বুঝলে,,,।
-হুম,,,।
কর্তী এবার আসান ধরে মুখোমুখী বসাটা ঠিক করলেন।এবার হাটু বরাবর তার ডান কনুইটা রেখে হাতের তালুটা নিজের থুথুনিতে লাগিয়ে স্বামীর চোখঁ বরাবর চোখঁ রাখলেন।স্বামীও তার চোখঁ বরাবর এক দৃষ্টিঁতে চোখঁ রাখলেন।চলে মিনিট দুএক এরপর স্বামী চোখ ফিরিয়ে নিলেন।কর্তীর হৃদয় ভাসে ভালবাসার সাগরে।
-এই যে চোখ ফিরিয়ে নিলে এটাও কি ভালবাসা বলবে?
-এটাইতো প্রকৃত ভালবাসার রূপ।যে ভালবাসায় লজ্জা থাকে না সেখানে রিয়েল ভালবাসা থাকে না।লজ্জা ভয় সন্মানবোধ আর পারস্পরিক বোঝাপরা ভাল থাকে সেই ভালবাসা জেগে থাকে দিন দিন প্রতি দিন।