রাসলীলা

রাসলীলা

সনাতন হিন্দু ধর্মালম্বীদের একটি বাৎসরিক উৎসব হলো রাসযাত্রা । রস থেকেই রাস শব্দের উৎপত্তি। রাস হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের সর্বোত্তম মধুর রস। আর লীলা মানে খেলা। অর্থাৎ রাসলীলার মানে শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরাধা ও তাদের সখী-সাথীদের লীলাখেলা। শরৎকাল শেষ হয়ে এল। এবার বাতাসে আসন্ন শীতের আমেজ। সামনেই কার্ত্তিক পূর্ণিমা। কি এই কার্ত্তিক পূর্ণিমার তাৎপর্য? আসুন সুধীজন, আমরা দুচোখে মেখে নিই মায়া অঞ্জন আর দিব্য দৃষ্টি দিয়ে অবলোকন করি।

দেখতে পাচ্ছেন সুধীজন ওই...ওই যে বৃন্দাবন...যমুনার তীর। ধীরে ধীরে সাঁঝ নামছে যমুনা তীরে। পাখিরা কুলায় ফিরে যাচ্ছে...সাঁঝবেলায় গোপীরাও যমুনার জলে গা ধুয়ে তাদের ঘরে ফিরে গিয়েছে। ঘরের কাজে ব্যস্ত তারা। যমুনার আশেপাশে জঙ্গল জুড়ে নেমে আসছে ঘন অন্ধকার। সেই ঘন অন্ধকার ফুঁড়ে একসময় আকাশে ওঠে চাঁদ। গোল থালার মত...আকাশকে রক্তিম আভায় রাঙিয়ে দিয়ে। এই চাঁদ সাধারণ চাঁদ নয়। বহুদিন বাদে স্বামী ঘরে ফিরে এসে যেমন স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয় – এই চাঁদ যেন সেই বিরহাতুর স্বামীর প্রতিভূ। শুধু তাই নয় এ চাঁদ যেন দিব্যভাবে উদ্ভাসিত। 

কেন এই দিব্যভাব?

কারণ এই কার্ত্তিক পূর্ণিমার রাতেই যে অনুষ্ঠিত হবে রসিক কৃষ্ণের রাসলীলা। ‘রাস’ এসেছে ‘রস’ থেকে। ‘রস’ মানে আনন্দ, দিব্য অনুভূতি, দিব্য প্রেম। ‘লীলা’ অর্থ নৃত্য। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গোপীদের সঙ্গে লীলা করবেন। ‘চীরহরণের’ পর গোপীদের সঙ্গে তাঁর এই লীলা। গোপীরা অধীর অপেক্ষা করছে কবে তাদের ডাক আসবে তাদের প্রাণপ্রিয়সখা শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে। ডাক আসবে গো আসবে। তাই আজ কার্ত্তিক পূর্ণিমায় ঐ সুগোল চাঁদের মায়াময় নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে বনাঞ্চলে। রক্তিম চাঁদকে দেখে মনে পড়ে যাচ্ছে রাধারাণীকে।

অমনই সুন্দর চাঁদপানা মুখ রাধারাণীর। তোমরা যেসব স্বামীরা দূর বিদেশে অনেকদিন অতিবাহিত করে স্বস্থানে ফিরে এসেছো তারা তোমাদের লজ্জাবনতা প্রেয়সীর মুখে মাখিয়ে দিও কুমকুমের রক্তরাগ। দেখো প্রেয়সীর মুখখানি রাধারাণীর মতই চন্দ্রানন হয়ে উঠেছে কি না! এই শারদ রাত, এই চাঁদ, চারিদিক মাতাল করা মল্লিকার গন্ধ – এসব কিছুই সাধারণ নয়, এক দিব্যভাবে স্নাত – অলৌকিক এক মায়ায় আচ্ছন্ন। ভগবান কৃষ্ণ যখন দেখলেন ঐ পূর্ণচন্দ্র ধীরে ধীরে রক্তিম থেকে গৈরিক বর্ণ ধারণ করল এবং সমগ্র অরণ্য প্লাবিত হল জ্যোৎস্নায় তখন তিনি তাঁর হাতে তুলে নিলেন মোহন বাঁশি। ফুঁ দিলেন বাঁশিতে। মধুর বংশীধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল বনে বনাঞ্চলে, যমুনার তীরে...।

ওহ্, কি মধুঢালা সে সুর! সেই মন মাতাল করা সুর শোনা মাত্রই গোপীদের মন উন্মনা হল। আশ্চর্য এই সুর কেবল গোপীরাই শুনতে পেল, যারা কৃষ্ণপ্রেমে পাগল – কৃষ্ণ যাদের প্রাণপ্রিয়সখা।। আর কেউ শুনতে পেল না সেই সুর। এমনকি মা যশোদাও নন। এই সুর এমনই সুর যা গোপীদের তীব্রভাবে আকর্ষণ করল। যেন এই সুর আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলল গোপীদের আর রশির মত টেনে নিয়ে আসতে লাগল তাদের কানহাইয়ার দিকে। বৃন্দাবনের সকল তরুণী গোপী যারা কৃষ্ণের প্রেয়সী – তাদের মন বাঁধা পড়ল কানহাইয়ার সাথে।

তারা একে অপরের মনোভাব না জেনেই ছুটে চলল সেই বাঁশির সুরের অনুসন্ধানে। কোথায় কৃষ্ণ? কৃষ্ণের এই বাঁশির সুর ছিল ‘অনঙ্গ বর্দ্ধনম’। কেউ যদি ভগবানকে স্পর্শ করার জন্য উন্মুখ হয় বা খাওয়াবার জন্য ব্যাকুল হয় কিংবা ভগবানের কাছ থাকে আনন্দ পেতে চায় বা তাঁকে আনন্দ দিতে চায়, তখন তাকে বলে অনঙ্গ। ‘অনঙ্গ’ কথাটির আক্ষরিক অর্থ ‘কাম’। কিন্তু গোপীদের সম্পর্কে অনঙ্গ শব্দের এমন স্থূল অর্থ করা অপরাধ। কৃষ্ণের প্রতি তাদের প্রেম আধ্যাত্মিক – জাগতিক নয়। তাদের সবটুকু দিয়ে তারা কৃষ্ণকে ভালবেসেছে। সেখানে কোন স্বার্থ নেই, কোন দ্বন্দ্ব নেই। তাই কৃষ্ণের বাঁশি তাদের সেই প্রেমকে আরো আরো ঘনীভূত করেছে।

যেমন ধোঁয়ার আড়ালে আচ্ছাদিত আগুন বাতাস লাগলে যেভাবে দ্বিগুণবেগে প্রজ্বলিত হয়ে ওঠে, ঠিক তেমনি গোপীরা কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা হয়ে উঠল। বাঁশি যেন বলছে, ‘সখীরা, তোমরা তাড়াতাড়ি এসো। আমি তোমাদের জন্য আকুলভাবে অপেক্ষা করে চলেছি। এই স্থান – এখানে কোন জনমানব নেই – নির্জনতায় ঢাকা – নিশীথ রাত্রি এখানে বড় মায়াময় – মল্লিকার সৌরভে আর চাঁদের আলোয় এই স্থান যেন প্লাবিত হচ্ছে। ওগো, গোপীগণ, তোমরা যে যেখানে যে অবস্থায় আছো, চলে এসো’। বাঁশির সুর চুম্বকের মত আকর্ষণ করল গোপীদের। তারা কেউ কেউ গোরুর দুধ দুইছিল, কেউ বা উনুনে দুধ গরম করছিল।

যেই বাঁশির সুর কানে গেল অমনি তারা দুধ দোওয়া ফেলে ছুটল – গোরুর পা বাঁধা রইল, বাছুরটিকে মায়ের কাছে এনে দিতে ভুলে গেল, উনুনে দুধ উথলে উঠল – না, কোন দিকে নজর নেই – সব ছেড়ে গোপীরা ছুটল। কর্মত্যাগ হল তাদের – যতিকর্ম ত্যাগ। কেউ কেউ আবার পতিসেবা করছিল বা সান্ধ্য আহার প্রস্তুত করছিল অথবা প্রসাধন করছিল, অঙ্গরাগে অঙ্গমার্জনা করছিল বা পোশাক পরিধান করছিল – সব কাজ তাদের অসম্পূর্ণ রইল – তারা ধাবিত হল কৃষ্ণসন্দর্শনে। তাদের লোকত্যাগ হল অর্থাৎ পরিবার পরিজন আর তাদের আপন রইল না। কেউ কেউ দুগ্ধপানরত ছোট শিশুকে ফেলে ছুটল – পড়শী, পরিজনরা বলল পাষাণী মা – গোপীদের কানে গেল না সেকথা – তারা শিশু ফেলে ছুটল।

স্নেহ বা প্রেম ত্যাগ হল তাদের। কেউ কেউ ছুটল ভোজন ত্যাগ করে। আবার কেউ বা বস্ত্র অলংকার পরিধান করছিল। সেসব অসমাপ্ত রইল। আলুথালু বেশভূষা নিয়েই তারা ছুটল কৃষ্ণসকাশে। দেহস্মৃতি বা দেহবোধও ত্যাগ হল তাদের। সর্বস্ব ত্যাগ করে গোপীরা ছুটল। কেউ তাদের ধরে রাখতে পারল না। তীব্র স্রোতের অভিমুখে যেভাবে নৌকা ধাবিত হয়, সেইভাবে গোপীরাও কৃষ্ণ অভিমুখে ধাবিত হল। তারা সংসার ধর্ম ত্যাগ করল, লোকত্যাগ করল, স্নেহ ও জাগতিক প্রেমও ত্যাগ করল। তাদের মন প্রাণ জুড়ে কেবল কৃষ্ণ। আর কিছু জানে না তারা, কেবল কৃষ্ণকেই জানে। ভগবানকে পেতে গেলে এভাবেই তো সর্বস্ব ত্যাগ করতে হয়। তা সত্ত্বেও শ্রীকৃষ্ণ গোপীদের পরীক্ষা করার জন্য বললেন, এই যে তোমরা এই রাতে পরিবার পরিজন সংসার ছেড়ে চলে এলে – এ তোমরা ঠিক করো নি। তোমরা ফিরে যাও।

কৃষ্ণের মুখে এই কথা শুনে গোপীরা স্তম্ভিত হয়ে গেল। ‘হে নাথ তোমার চরণস্পর্শ যে একবার লাভ করেছে তার কাছে এইসব জাগতিক বন্ধন যে মিছে। আবার যদি আমাদের সংসার বন্ধনে আবদ্ধ হতে হয় সে তো আমাদের চরম দুর্ভাগ্য হবে প্রাণনাথ’। শ্রীকৃষ্ণ এবার হাসলেন, বুঝলেন গোপীদের এই প্রেম নিখাদ, খাঁটি। তাই তিনি বললেন, ‘তোমাদের এই অহৈতুকি প্রেমের প্রতিদান আমি কখনই দিতে পারব না। আমি তোমাদের কাছে চিরঋণী থাকব’। কৃষ্ণ এবার গোপীদের সঙ্গে নৃত্যগীতে নিবিষ্ট হলেন।

গোপীরা কৃষ্ণের সান্নিধ্যলাভ করে ধন্য হল। কৃষ্ণের নিবিড় সান্নিধ্য কিন্তু গোপীদের মধ্যে জন্ম দিল আত্মম্ভরিতা – তারা মনে করল তারাই অত্যন্ত সৌভাগ্যবতী যে কৃষ্ণপ্রেমে অবগাহন করতে পেরেছে। এই আত্মম্ভরিতা দূর করার জন্য কৃষ্ণ অকস্মাৎ গোপীদের মধ্য থেকে অন্তর্হিত হলেন। কানহা অদৃশ্য হওয়ায় গোপীদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।অন্তরে তীব্র বিরহ জ্বালা নিয়ে তারা কৃষ্ণকে খুঁজে বেড়াতে লাগল। ওগো নদীতীর, তরুদল তোমরা বলে দাও কৃষ্ণ কোথায়? আমাদের শ্যামকে এনে দাও।

নবদূর্বাদলশ্যামকে খুঁজতে খুঁজতে তারা একসময় দেখতে পেল কৃষ্ণের পদচিহ্ন। কৃষ্ণের পদচিহ্নের পাশে পাশে এ কোন রমণীর পায়ের ছাপ! এ তো শ্রীরাধিকা! আমাদের শ্যাম তবে রাধাকে নিয়ে অন্তর্হিত হয়েছেন? সুধীজন, আসুন, আমরা দেখি, কৃষ্ণ রাধারাণীকে নিয়ে গভীর বনমধ্যে কোথায় হারিয়ে গেলেন? রাধা, পরম সৌভাগ্যবতী রাধা কানহাইয়ার সঙ্গে একাই রাসলীলার আনন্দ উপভোগ করলেন? কৃষ্ণকে একা পেয়ে রাধারও বড় অহংকার হল। আমি তাহলে অন্য গোপীদের চাইতেও সৌভাগ্যবতী যে শ্যামকে একা পেলাম!

তাই শ্রীরাধিকা শ্যামকে বললেন, ‘ওগো শ্যাম, আমার প্রাণাধিক, এতখানি হেঁটে এসে আমি বড় ক্লান্ত। আমার পা আর চলছে না। দয়া করে আমাকে তোমার কাঁধে তুলে নাও।’ শ্যাম এবার মুচকি হাসলেন। ‘এসো রাধে’ বলে রাধাকে কোলে তুলে নিলেন। এবার পথিমধ্যে রইল শুধু শ্যামের পদচিহ্ন কিন্তু সে চিহ্ন যেন অধিক গভীর। হবেই তো, কানহা যে রাধাকে কোলে তুলে নিয়েছে! কিন্তু এ সুখ রাধার কপালে সইল কি? কিছুদূর এভাবে যাওয়ার পর শ্যাম আবার অন্তর্হিত হলেন।  

‘শ্যাম, শ্যাম, তুমি আমায় ফেলে কোথায় গেলে?’

রাধারাণী এ শোক সইতে পারলেন না। জ্ঞান হারালেন। সেই মূহুর্তে গোপীরা খুঁজতে খুঁজতে রাধাকে একা অচৈতন্য অবস্থায় পেয়ে অবাক হয়ে গেল। রাধার জ্ঞান ফিরলে তারা সকলে মিলে রোদন করতে করতে ফিরে গেল যমুনার তীরে। কৃষ্ণের ধ্যান করতে করতে তারা গাইতে লাগল গোপিকা গীত। হে কৃষ্ণ, আমরা তোমার জন্য সব কিছুই ত্যাগ করলাম। লোক, লাজ, ভয়, কাম, অহংকার – সকলই ত্যাগ করলাম। আমাদের অন্তর জুড়ে শুধু তুমি। তুমি আমাদের হৃদয়ে আছো সখা। আমরা চিরকাল তোমাকে হৃদয়েই অধিষ্ঠিত করে রাখবো।

শুধু তুমি দেখা দাও, নাথ, তুমি দেখা দাও। গোপীরা সম্পূর্ণভাবে কৃষ্ণের শরণাগত হল। শরণাগত। শরণাগত। হে প্রভু, তোমাকে ছাড়া আর কিছুই জানি না। তাদের দুচোখে দরদর অশ্রুধারা। অন্তর প্রেমে উদ্বেল। এবার ভগবানের আসন টলল। কৃষ্ণ গোপীদের সম্মুখে আবির্ভূত হলেন। কি অপূর্ব রূপ তাঁর। রূপ থেকে যিনি গোপীদের অরূপে নিয়ে গেলেন – সেই নবদূর্বাদলশ্যামের গলায় বৈজয়ন্তীফুলের মালা, পরনে পীতবাস। মুখে মধুর হাসি। কানহাইয়াকে দেখে গোপীদের চোখের পলক পড়ে না।

তারা নবজীবন লাভ করল। কাম জয় করে হল নিষ্কাম। নেতি নেতি নেতি নেতি ইতি। রাসলীলার মধ্য দিয়ে এভাবে পেল তারা অরূপরতন। রূপসাগরে ডুব দিয়ে অরূপরতন খুঁজে পাওয়া। ভগবান কারো একার নন। তিনি সকলের। তাই এক কৃষ্ণ বহু হলেন। রাসলীলা করলেন গোপীদের সঙ্গে। এই হল ভারতীয় দর্শন। প্রেমের মধ্য দিয়ে আমরা ভগবানেরই জয়গান গাই। এ প্রেম আমাদের স্বর্গীয় আনন্দ দেয় ইংরেজীতে যাকে বলে ecstasy বা পরমানন্দ।