প্রতিবেশিকে পিটিয়ে মারালেও দাঁড়িয়ে দেখল পাড়ার লোক,ফোন করেও আসল না মালদার পুলিশ

অসহায় মহিলা

দেবু সিংহ আজবাংলা মালদা, বাড়ির দরজার সামনে ৮ থেকে ১০ জন লোক। হাতে লোহার রড ও বাঁশের মোটা লাঠি। প্রাণে মেরে ফেলার।হুমকি লাগাতার দিচ্ছিল তারা। স্বামীকে নিয়ে দরজা বন্ধ করে লুকিয়ে ছিলেন স্ত্রী। এরপরই দরজায় পড়তে থাকে একের পর এক লাথি। অসহায় মহিলা সাহায্যের জন্য জানলা দিয়ে চিৎকার করে ডাকতে থাকেন পাড়ার লোকেদের। অনেকেই বেরিয়ে এলেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন নি কেউই। পাঁচশো মিটারের মধ্যে থানা। বারবার ফোন করে পুলিশকে আসার অনুরোধ করলেও আসল না পুলিশ। এরপরই দরজা ভেঙে ঘরের ভেতর ঢুকে ওই ব্যক্তিকে পিটিয়ে মেরে ফেলার অভিযোগকে ঘিরে উত্তাল হয়ে উঠল পুরাতন মালদা। মৃত ওই ব্যক্তির স্ত্রীর অভিযোগ, ঘটনার সময় বার বার পুলিশকে ফোন করলেও পুলিশ আসতে অনেক দেরী করে। সোমবার ওই ঘটনা ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়ায় পুরাতন মালদা পৌরসভা ৫ নম্বর ওয়ার্ডের শর্বরীতে। ইতিমধ্যেই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে একজনকে আটক করেছে পুলিশ।ফের মধ্যযুগীয় বর্বরতার সাক্ষী হয়ে থাকল পুরাতন মালদা। পাড়া ভর্তি লোকের সামনে একজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলে পালিয়ে গেল দুষ্কৃতীরা। মৃত ওই ব্যক্তির স্ত্রীর অসহায় চিৎকারেও কান দিলেন না কেউ।পুরাতন মালদা পৌরসভার 5 নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ভুপাল প্রামানিক (৪৮)। বাড়িতে রয়েছেন তার স্ত্রী তপতী প্রামানিক। তার এক ছেলে কলকাতায় পড়াশোনা করেন। অভিযোগ, সোমবার বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ ভূপাল প্রামানিকের বাড়ির তালা ভেঙে ঘরের ভেতরে ঢুকে পিটিয়ে খুন করে ৮ থেকে ১০ জনের একটি দল। স্বামীকে বাঁচাতে গেলে লাথি মেরে ফেলে দেওয়া হয় তার স্ত্রী তপতী প্রামাণিককেও। পাড়ার লোকেদের কাছে স্বামীকে বাঁচানোর কাতর আর্জি নিয়ে আবেদন জানালেও এগিয়ে আসেননি কেউ বলে অভিযোগ। পুলিশকে ফোন করেও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ এনেছেন মৃতের স্ত্রী। মাত্র পাঁচশো মিটার দূরে মালদা থানা। সোমবার ডিউটিরত অফিসারকে বারবার ফোন করলেও আসেনি পুলিশ। উল্টে বলা হয়েছে , আগে ঘটনা ঘটুক তারপর জানাতে। ওই ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়ায় এলাকায়।পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শর্বরীর বাসিন্দা ভূপাল মণ্ডল পেশায় বাঁশের হস্তশিল্পী। তার কাছে বাঁশ ও বেতের হস্তশিল্প শেখেন অনেকেই। প্রায় বছর খানেক আগে 5 নম্বর ওয়ার্ডেরই বাসিন্দা সীমা দাস নামে এক যুবতী তার কাছে বাঁশের কাজ শিখতে আসেন। এরপর ওই যুবতীর সঙ্গে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন ভূপাল। এমনকি ওই যুবতীর বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরও তাকে নিয়ে অন্যত্র পালিয়ে যান ভুপাল। কয়েক মাস আগে ভূপালের বিরুদ্ধে সীমা দাসের বাড়ির লোকজন মালদা থানায় অভিযোগ দায়ের করলে প্রায় মাস তিনেক কারা বাস করে গত শনিবার জামিনে ছাড়া পেয়ে বাড়িতে ফিরেছিলেন ভূপাল। ভূপালের স্ত্রী অভিযোগ করেছেন, তার স্বামী জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর থেকেই সীমার পরিবারের লোকজন লাগাতার হুমকি দিচ্ছিল । ১০ লক্ষ টাকা দাবিও করা হয়েছিল ভূপালের কাছে। টাকা না দিলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি সীমার বাড়ির লোকেরা দিয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তপতী। বিষয়টি থানাতেও জানিয়ে রেখেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে সোমবার যে ঘটনা ঘটেছে তার জন্য কোন ভাবেই প্রস্তুত ছিলেন না তপতী ও তার পরিবার। তিনি জানান, এদিন বিকেল আড়াইটার পর থেকেই তার বাড়ির সামনে জড়ো হতে থাকেন সীমার বাড়ির লোকেরা। যার মধ্যে ছিলেন সীমার বাবা মিলন দাস, কাকা টিংকু দাস, ভাই ভোলা দাস ও মা অর্চনা দাস সমেত ৮ থেকে ১০ জন ব্যক্তি। ঘন জনবসতিপূর্ণ ওই পাড়ার ভূপাল প্রামানিকের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েই অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও চিৎকার করতে থাকে তারা। এমনকি ভূপালকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বারবার হুমকি দিতে থাকে তারা। ঘটনা খারাপ দিকে মোড় নিতে পারে আশঙ্কা করেই ভেতর থেকে দরজায় তালা বন্ধ করে দেন ভূপালের স্ত্রী। এরপর সীমার পরিবারের লোকজন আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ। হাতে লোহার রড ও মোটা বাঁশের লাঠি নিয়ে দরজায় লাথি মারতে থাকে তারা। ওই সময়ে তপতী দেবী জানালা দিয়ে চিৎকার করে পাড়ার লোকেদের জড়ো করার চেষ্টা করেন। তপতী দেবী জানান,” স্বামীকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছিল ওরা। আমি চিৎকার করে পাড়ার লোকেদের ডাকতে থাকি সাহায্যের জন্য। অনেক লোক বেরিয়ে এলেও কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসেননি। তারপর আমি পুলিশকে ফোন করি। যদিও পুলিশের কোন রকম সাহায্য পাইনি। চোখের সামনে ওরা দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকলো। এরপর স্বামীকে টেনে নিয়ে গিয়ে লোহার রড ও বাঁশের মুগুর দিয়ে মাথায় এলোপাতাড়ি মারতে থাকল। আমি বাধা দিতে গেলে আমাকে লাথি মেরে বাইরে ছিটকে ফেলে দেওয়া হয়। সীমা দাসের বাবা মিলন দাস, কাকা রিন্টু দাস ও ভোদল দাস, দাদা ভোলা দাস এবং মা অর্চনা দাস মিলে পিটিয়ে মেরে ফেলে আমার স্বামীকে। চোখের সামনে ছটফট করতে করতে নেতিয়ে পরল আমার স্বামী। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল বাড়ি। সবাই দাঁড়িয়ে দেখল অথচ কেউ এগিয়ে এলো না। পুলিশ অনেক দেরি করে এসেছে। এমনকি আমার স্বামীকে অ্যাম্বুলেন্সে নয় টোটোতে বসিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।” এদিকে ওই ঘটনার পর পরই ওই এলাকায় ছেড়ে পালিয়ে যায় অভিযুক্তরা। মালদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে গোপাল প্রামানিককে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। ময়না তদন্তের জন্য দেহটি মর্গে পাঠানো হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ ঘটনাস্থলে পৌঁছান মালদা থানার আইসি শান্তিনাথ পাঁজা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হেডকোয়ার্টার অরিন্দম সরকার ও ডিএসপি ডিএনটি শ্যামল মন্ডল। ঘটনাস্থলের ছবি ও নমুনা সংগ্রহ করেন তারা। হাসপাতাল থেকে ভূপাল প্রামানিকের স্ত্রী তপতী প্রামানিক ও শ্যালিকা তাপসী প্রামাণিক ফিরে এলে তারা মালদা থানায় গিয়ে সীমা দাসের পরিবারের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পুলিশ সূত্রে খবর ইতিমধ্যে ওই ঘটনায় মিলন দাসকে আটক করা হয়েছে। সূত্রের খবর, গোপাল প্রামানিককে পিটিয়ে খুনের কথা স্বীকার করেছেন তিনি। এদিকে দিনের আলোয় এমন বর্বরোচিত ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরেও কেন কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলেন না তা নিয়ে হতবাক সকলেই। এদিন ঘটনা সম্পর্কে প্রতিবেশীদের জিজ্ঞেস করা হলেও প্রত্যেকেই জবাব দেন তারা কিছু দেখেননি, তারা কিছু জানেননা। ঘন জনবসতিপূর্ণ পুর এলাকায় এরকম ঘটনা ঘটে গেলেও কি করে পাড়ার মানুষ নির্বিকার থাকেলেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পুলিশ জানিয়েছে ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।