তারকেশ্বরের তারকনাথ পূরণ করেন সকলের মনস্কামনা

তারকেশ্বরের তারকনাথ পূরণ করেন সকলের মনস্কামনা

আজবাংলা  হুগলী      শ্রাবণ মাস এলেই দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রবল বৃষ্টি সহ্য করে পথে নামেন। গন্তব্য গঙ্গা বা কাছাকাছি অন্য যে কোনও নদী। নদীতে গিয়ে দু’ঘড়া জল ভরে, শিবমন্দিরে গিয়ে শিবের মাথায় সেই জল ঢালেন। প্রথাটি অদ্ভুত মনে হতে পারে, কিন্তু এ ভাবেই হিন্দুধর্ম যুগে যুগে গঙ্গা ও ভক্তিপ্রাণ মানুষের মধ্যে কায়িক-মানসিক সংযোগ সাধন করে চলেছে। গঙ্গা তো শুধু এক নদী নয়, সর্বগ্রাহী এক ধর্মেরও রূপক।

ঘটনাচক্রে আমাদের রাজ্যের তিন প্রধান তীর্থ— গঙ্গাসাগর, কালীঘাট ও তারকেশ্বর— গঙ্গার সঙ্গে ওতপ্রোত। এদের মধ্যে তারকনাথের মন্দিরটি তুলনায় নবীন। তবু, তারকেশ্বরের ইতিহাস ঘাঁটলে বাঙালির ধর্মীয় ইতিহাস সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। ‘মহালিঙ্গার্চ্চন’ গ্রন্থে লেখা আছে: ‘‘ঝাড়খণ্ডে বৈদ্যনাথো বক্রেশ্বরস্তথৈবচ/ বীরভূমৌ সিদ্ধিনাথো রাঢ়ে চ তারকেশ্বর।’’

তারাকনাথ মন্দির কলকাতার থেকে ৫৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। পশ্চিমবঙ্গের  হুগলি জেলার তারকেশ্বর শহরে অবস্থিত |  এটি একটি বিখ্যাত হিন্দু মন্দির | শোনা গিয়েছে, তারকেশ্বর মন্দিরটি প্রতিষ্ঠাতা করেছিলেন উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা বিষ্ণুদাস নামের এক শিবভক্ত |

উত্তরপ্রদেশ থেকে এসে হুগলিতে বসবাস শুরু করেছিলেন তিনি | ১৭২৯ সালে মল্ল রাজারা মন্দিরটির সংস্কার করেন । লোকমুখে শোনা গিয়েছে, বিষ্ণুদাসের ভাই দেখেন স্থানীয় একটি জঙ্গলে একটি কালো পাথরের ওপর গরুরা নিয়মিত দুধ দান করে আসে |

এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখার পরেই তিনি তার দাদা বিষ্ণুদাসকে জানান | তারপরেই স্বপ্নাদেশ পান তিনি এবং তারপর থেকেই ওই পাথরটিকে শিবজ্ঞানে পুজো করা শুরু করেন বিষ্ণুদাস | গড়ে ওঠে শিব মন্দির | শিবের তারকেশ্বর রূপ অনুসারে এই মন্দিরের নামকরণ করা হয় |

বেশ অনেকবারই এই শিব মন্দিরকে মেরামত আর পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে | মন্দিরটিকে মল্ল রাজারা নতুন করে সংস্কার করেন ১৭২৯ সালে | তারকেশ্বরের তারাকনাথের মন্দিরটি একটি আটচালা মন্দির | বর্তমানে মন্দিরটিকে যে ভাবে দেখি, তা মল্লরাজাদেরই তৈরি |

মন্দিরের উল্টো দিকেই রয়েছে নাটমন্দির | যেখানে হাজারে হাজারে মানুষ বসে তাদের মনের কথা বাবাকে জানান | শ্রাবণ মাসে তারকেশ্বরে তারাকনাথের মাথায় জল ঢালতে হাজির হন হাজার হাজার মানুষ | পায়ে হেটে কাঁধে বাঁক নিয়ে মাইলের পর মেইল হেটে উপস্থিত হন সকলে |

হুগলির বৈদ্যবাটির নিমাই তীর্থ ঘাট থেকেই বেশি ভাগ মানুষ কাঁদে জল নিয়ে রওনা হন বাবা তারানাথের মাথায় জল ঢালার জন্য | এমনিতে নিজের বা পরিবারের মঙ্গল কামনায় বর্তমানে সারা বছরই হাজার হাজার মানুষের আনাগোনা তারকেশ্বরের মন্দিরে |এই তারকেশ্বর মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে নানা জনশ্রুতি |

তারসঙ্গে মন্দিরের বা দিকে রয়েছে একটি পুকুর | যেটিকে সকলে দুধপুকুর বলে চেনে | সেই দুধপুকুরকে নিয়েও প্রচলিত রয়েছে নানা লোককথা ও বিশ্বাস | এখনও হাজার হাজার মহিলা সন্তান কামনায় বা সন্তানের মঙ্গল কামনায় তারকেশ্বর মন্দিরে ছুটে আসেন | মনস্কামনার জন্য মন্দিরের বিভিন্ন দিকে মানুষ ঢিল বেঁধে আসেন | মন্দির লাগোয়া একটি কালী মন্দিরও রয়েছে |