কালসর্প যোগ কী?কী রকম অবস্থানে কালসর্প যোগের অশুভত্ব অনেকটা কম ভোগ করতে হয়

আজবাংলা কাল’ শব্দের অর্থ ‘মৃত্যু’ আর ‘সর্প’ বলতে একানে সর্পিলাকৃতিকে বোঝানো হয়েছে। কাল ও সর্প যদি একত্র হয়, তা হলে ব্যক্তির জীবনে দুঃসময়ের সূত্রপাত ঘটে।ভারতীয় জ্যোতিষে কালসর্প যোগ বা কালসর্প দোষকে এক ভয়াবহ দশা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। যে ব্যক্তির এই যোগ থাকে, তাঁকে সারাজীবন বিভিন্ন দুর্ভাগ্যের সঙ্গে লড়াই করে যেতে হয়। অনেকটা গ্রিক ট্র্যজেডির নায়কের মতো হয়ে ওঠে তাঁদের জীবন। শত চেষ্টাতেও তিনি সেই দুর্ভাগ্যকে জয় করতে পারেন না। কালসর্প যোগে বলতে মানুষের মনে একটা ভয় সৃষ্টি হয়। কিন্তু এটা একদমই ঠিক নয়। রাহু ও কেতুর একপাশে সমস্ত গ্রহ থাকলে কালসর্প যোগ সৃষ্টি হয়। সাধারণ ভাবে কালসর্প যোগ অশুভ হলেও, সব ক্ষেত্রে এই যোগ অশুভ হয় না। জন্মকুণ্ডলীতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে গ্রহের অবস্থান এমন থাকে, যা কালসর্প যোগের অশুভ প্রভাব অনেকটা কমিয়ে দেয়। কালসর্পযোগের পিছনে রাহু ও কেতুর ভূমিকা রয়েছে। পুরাণ মতে, স্বরভানু নামে এক অসুর সমুদ্র মন্থনের কালে অমৃত আস্বাদন করেছিল। তার মুণ্ড ছিন্ন করেন মোহিনীরূপী বিষ্ণু। কিন্তু তার ছিন্নমুণ্ড ও ধড় অমৃতপানের ফলে অমরত্ব লাভ করে। মুণ্ডটি রাহু এবং দেহটি কেতু নামে পরিচিত হয়ে মহাবিশ্বে ঘুরে বেড়াতে থাকে। কোনও ব্যক্তির জন্মকুণ্ডলিতে রাহু ও কেতুর অবস্থান বিন্দু দু’টির মাঝখানে যদি বাকি গ্রহগুলি আটকে পড়ে, তাঁর কালসর্পযোগ ঘটেছে ধরে নিতে হবে।এমন অবস্থায় যদি কেউ জন্মান, তাঁকে জীবনে বার বার মৃত্যু-স্বরূপ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় বলে অভিমত জ্যোতিষের।তামাম জ্যোতিষ শাস্ত্রে কালসর্প যোগকে ভয়াবহ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।সকলের কুণ্ডলিতে কালসর্প একই রকমভাবে অবস্থান করে না। রাহু ও কেতুর অবস্থান-হেতু এই যোগেরও রকমফের ঘটে। মোটামুটিভাবে ৭টি কালসর্প যোগের কথা জ্যোতিষ জানায়।আবার লগ্ন যদি অন্য আলাদা ঘরে থাকে, তখন ১২ রকমের কালসর্প যোগ হতে পারে। স্বভাবতই এই সব যোগগুলো সমান অশুভ হয় না। যে কোনও ছকে যা বিচার করতে হবে, তা হল কালসর্প যোগের মধ্যে ক’টি অশুভ গ্রহ আছে আর ক’টি শুভ ভাব আছে। অশুভ ভাবগুলোতে অশুভ গ্রহ থাকলে অশুভ ফলের প্রাপ্তি ঘটবে এবং শুভ ভাবগুলোতে শুভ ফল লাভ হবে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা মিশ্র ফল দেখে থাকি। গ্রহগুলো যখন শুভ ও অশুভ ভাবে ছড়িয়ে থাকে সেরূপ ক্ষেত্রে জীবনে এক সময় শুভ ফল আসবে আবার অন্য সময়ে অশুভ ফল হবে। অনন্ত কালসর্প— লগ্নে রাহু এবং কেতু সপ্তমে অবস্থান করলে এমন হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি ক্রমাগত ষড়যন্ত্রের শিকার হন, বিবাহে বিপর্যয় আসে, মামলায় বার বার হেরে যান। কুলিকা কালসর্প— দ্বিতীয়ে রাহু এবং অষ্টমে কেতুর অবস্থান। আক্রান্তকে তীব্র অর্থসংকটে পড়তে হয়।বাসুকী কালসর্প— তৃতীয়ে রাহু এবং নবমে কেতুর অবস্থান। পুত্র-কন্যা নিয়ে ক্রমাগত সংকট ঘটে। শঙ্খপাল কালসর্প— চতুর্থে রাহু এবম দশমে কেতু স্থিত হলে এমন হয়। স্থাবর সম্পত্তি নিয়ে সংকট দেখা দেয়। পদ্ম কালসর্প— পঞ্চমে রাহু এবং একাদশে কেতু। লটারি, শেয়ার বাজার, জুয়ায় বার বার বিপর্যয়। মহাপদ্ম কালসর্প— ষষ্ঠে রাহু আবং দ্বাদশে কেতু। আক্রান্ত ব্যক্তির জীবনে সম্পর্কঘটিত বিপর্যয় লেগে থাকে। তাঁরা স্ত্রীর বিশ্বাস অর্জনেও ব্যর্থ হন। তক্ষক কালসর্প— সপ্তমে রাহু এবং প্রথমে কেতু অবস্থান করে। আক্রান্তরা সর্বত্র ষড়যন্ত্রের শিকার হন।
যদি কোনও জাতচক্রের কালসর্প যোগের ক্ষেত্রে পাপগ্রহরা অশুভ ভাবে থাকে, তাদের অশুভ ফল খুব বেশি হয়। কিন্তু শুভ গ্রহ যোগে অশুভ ফল না হয়ে শুভ ফলের আধিক্য ঘটে। এই ধরনের মিশ্র ফল সাধারণত সকল কালসর্প যোগেই হয়ে থাকে।আমাদের দেশে অনেক নামী মানুষ আছেন যাঁদের কালসর্প যোগে জন্ম। কালসর্প যোগে জন্ম হয়েও তাঁদের অভাবনীয় প্রতিভা। তাই কালসর্প যোগ থাকলেও কোনও কোনও সময় উন্নতি করা যায়।