ঘুরে আসুন পাহাড়ি গ্রাম তাবাকোশি

ঘুরে আসুন পাহাড়ি গ্রাম তাবাকোশি

 বাঁধা ভ্রমণের ছকের বাইরে বাঙালি পর্যটকদের চোখ এখন নতুনত্ব চায় তাবাকোশি  Tabakoshi। এই পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই আরও কত অজানা, অচেনা জায়গা থেকে গেছে লোকচক্ষুর আড়ালে। দার্জিলিং-এর মিরিক শহর অনেকেরই ঘোরা, কিন্তু এই মিরিকের অনতিদূরেই পাহাড়-ঘেরা এক ছোট্ট সুন্দর গ্রাম রয়েছে। তারই নাম তাবাকোশি। নামের মধ্যে জাপানি বা চিনা অনুষঙ্গ থাকলেও এই গ্রামে আসলে থাকেন লেপচারা।

প্রায় তিন হাজার ফুট উচ্চতায় এই তাবাকোশি গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন ভরে উপভোগ করা যায়। শান্ত, নিবিড় গোপালধারা চা বাগান আর পাহাড়ি খরস্রোতা উচ্ছ্বল রংবংখোলা নদীর মাঝে লেপচাদের এই গ্রামে দু-তিন দিনের ছুটিতে চলে আসাই যায়। পাখি দেখার নেশা থাকলে তাবাকোশি ভ্রমণ স্বপ্নপূরণের অন্যতম ঠিকানা হতে পারে। মিরিক থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে রয়েছে এই তাবাকোশি গ্রাম।

যদি একে স্থানীয়রা রাংভাং নামেই চেনে বেশি। এর পাশ দিয়েই বয়ে গেছে রংবংখোলা নদী, এর স্থানীয় নাম রাংভাং নদী। এখান দিয়ে এই নদীটি চলে গেছে সোজা নেপালে, সেখানে আবার একে সকলে তাবাকোশি বা তামাকোশি নামে চেনে। শিলিগুড়ি থেকে তাবাকোশির দূরত্ব ৬০ কিমি। তাবাকোশি গ্রামের নামকরণের পিছনে একটা ইতিহাস রয়েছে। অনেক অনেক আগে এই জায়গাটির নাম ছিল গোপালখাড়া, অনেকে আবার গোপালধারাও বলে থাকেন। ঠিক একই নামের একটি চা বাগান রয়েছে এই অঞ্চলে।

চা বাগানের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে ক্ষীণস্রোতা পাহাড়ি নদী রংবংখোলা যার নেপালি নাম তাম্বাকোশি। বর্ষাকালে আগে যখন প্রচুর বৃষ্টি হত, শোনা যায় সেই সময় নাকি এই নদীর জল-কাদা সব একত্রে গুলে গিয়ে তামাটে রঙ ধারণ করে। সেই থেকেই সম্ভবত এই নদীর নাম হয়েছে তাম্বা। নেপালি ভাষায় ‘কোশি’ বলতে নদীকে বোঝায়। এই লোকশ্রুতি থেকেই সম্ভবত এই জায়গার নাম হয়েছে তাবাকোশি। চা বাগানের ঘেরা অতি সুন্দর মনোরম গ্রাম তাবাকোশি। চা বাগানের ভিতরে বসার জায়গাও করে দেওয়া আছে খুব সুন্দরভাবে।

ফুলের বাগানও রয়েছে আশেপাশে। এক কথায় বলতে হয় পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য যেন এখানে এসে ঠাঁই নিয়েছে রূপতৃষ্ণ পর্যটকদের মন ভোলাবে বলে। রংবংখোলা নদীতে সারা বছর খুব বেশি জল থাকে না, কিন্তু স্রোতের টান খুব বেশি। তবে বর্ষায় জলে ভরে ওঠে এই নদী, তখন এর রূপ যায় বদলে। নদীর উপরে ব্রিজও আছে। সেই ব্রিজে উঠে নদীর দিকে তাকালে এক অপরূপ সুন্দর দৃশ্য চোখে ভাসবে। ব্রিজের উপর দিয়ে কিছুদূর গিয়ে একটি নাগ মন্দির চোখে পড়বে। মন্দির চত্বরে কিছুক্ষণ নিরিবিলিতে সময় কাটানো যায়।

তাছাড়া রাতের তাবাকোশির সৌন্দর্য অনন্য। দূরের পাহাড়ে টিমটিম করে জ্বলা জোনাকির মত আলোগুলো দেখে মনে হবে যেন কোনও রূপকথার স্বপ্নপুরী। ট্রেনে করে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে মিরিক লেক যাওয়ার রাস্তা দিয়ে লেক ছাড়িয়ে ঢুকে পড়তে হবে গোপালধারা চা বাগানে। চা বাগানের ভিতর দুই কিমি. গেলেই রাংভাং মোড় পড়ে যেখান থেকে ডান দিকে উৎরাই পথে কম-বেশি পাঁচ কিলোমিটার নিচের দিকে নামলেই চোখে পড়বে এই তাবাকোশি গ্রাম।

এছাড়া শেয়ার জিপে মিরিক পর্যন্ত এসে তারপর গাড়ি ভাড়া করেও তাবাকোশি পৌঁছানো যায়। বিমানে এলে প্রথমে নামতে হবে বাগডোগরা বিমানবন্দরে, তারপর সেখান থেকে সরাসরি গাড়ি ভাড়া করে ৬১ কিমি. পথ পেরিয়ে তাবাকোশি চলে আসা যায়। অনেক সময় হোম-স্টে বুক করে রাখলে, তাদের নিজস্ব গাড়ির ব্যবস্থাও থাকে। ফলে হোম-স্টের গাড়ি করে সহজেই তাবাকোশি চলে আসতে পারবেন, প্রথমে সরাসরি হোম-স্টে’তে উঠবেন এবং পরে সময় করে ঘুরে দেখা যাবে গোটা গ্রাম।

২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী নিউ জলপাইগুড়ি থেকে মিরিক বাজার পর্যন্ত শেয়ার ট্যাক্সি বা গাড়ির ভাড়া পড়ে ৩০০ টাকা আর সেখান থেকে তাবাকোশি পর্যন্ত রিজার্ভ ট্যাক্সির ভাড়া ৬০০ টাকা। তবে চাইলে মিরিক বাজার থেকে শেয়ারে ৬০ টাকা জনপ্রতি ভাড়াতেও তাবাকোশি পৌঁছানো যায়। তাবাকোশিতে থাকতে হলে হোম-স্টে একমাত্র ভরসা।

হোম-স্টের মধ্যেই রান্নার বন্দোবস্ত থাকে। ফলে খাবার কোথায় পাবেন সে চিন্তাও করতে হবে না। টি-ভিলেজ হো-স্টে, খুশি ফার্ম হাউস, সোনাখাড়ি হোম-স্টে, ইয়েলমো হোম-স্টে ইত্যাদি এখানে সুপরিচিত থাকার জায়গা। একদিনের থাকা-সহ এখানে হো-স্টের খরচ মোটামুটি ১২০০ টাকা। তবে কেউ চাইলে মিরিকেও থাকতে পারেন। সেখান থেকে এসে তাবাকোশি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়। মিরিকের সুবিধে হল কম বাজেটেরও অনেক থাকার জায়গা পাওয়া যায়। তবে হোটেলই হোক বা হোম-স্টে আগে থেকে বুক করে তবেই আসাই উচিত।

তাবাকোশি ভ্রমণ বলতে তাবাকোশি গ্রামের পার্ক, রংবংখোলা নদী, নাগ মন্দির, বিষ্ণু মন্দির, গোপালধারা চা বাগান, তাবাকোশি পাবলিক পুল ইত্যাদি বিশেষ দ্রষ্টব্যের মধ্যে পড়ে। তাবাকোশি ঘুরতে এসে পাখি দেখা যায়, নদীর ধারে ক্যাম্প করা যায়, এমনকি নদীতে মাছও ধরা যায়। পাথরের উপর বসে পা দুটো রংবংখোলার শীতল জলে ভিজিয়ে কাটিয়ে দিতে পারেন অনেকটা সময়। জলের মধ্যে ছোট ছোট মাছও দেখতে পাবেন। কিছু কিছু হোম-স্টে থেকেই নদীর ধারে পিকনিকের ব্যবস্থা করে দেয়।

নদীর ধারে তাঁবু খাটিয়ে, ক্যাম্পফায়ারের উষ্ণতায় চায়ে চুমুক দিতে দিতে তাবাকোশির প্রকৃতির মায়ায় ডুবে যাবেন নিশ্চিত। গ্রামটা পুরো ঘুরে দেখতে চাইলে চোখে পড়বে কমলালেবুর বাগান, এলাচ ক্ষেত। নিত্যদিনের চাষবাসে ব্যস্ত স্থানীয় লেপচাদের ছবি তুলতে পারেন। এখানে বিভিন্ন জাতের পাখির আনাগোনা হয়। পাখিপ্রেমীরা নিশ্চিতভাবেই সঙ্গে করে দূরবীন নিয়ে বেরোবেন। সাইটসিইং-এর মধ্যে রয়েছে নিকটবর্তী মিরিক লেক, মিরিক বৌদ্ধমঠ।

এছাড়া ভারত ও নেপাল সীমান্তে অবস্থিত পশুপতি বাজার, সীমানা ভিউ পয়েন্ট কিংবা জোড়পোখরিতেও ঘুরে আসা যায় গাড়ি ভাড়া করে। তাবাকোশি গ্রামের চারপাশে প্রচুর চা-বাগান রয়েছে। হাতে সময় থাকলে প্রতিটি জায়গা ঘুরে দেখতে পারেন এক এক করে। তবে তাবাকোশিতে পাবলিক পুলে স্নান করার ইচ্ছা সংবরণ করা দরকার। অযত্নের কারণে এখানকার জল অস্বচ্ছ ও শ্যাওলা-মসে পরিপূর্ণ। ফলে জলে নামলে ত্বকের সমস্যা দেখা দিতেই পারে নানাবিধ জীবাণুর কারণে।

বছরের যে কোনও সময় তাবাকোশি ভ্রমণ করা যায়। তবে মার্চ থেকে জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত কিংবা অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে এলে এখানকার অতীব সুন্দর পরিবেশ ও তাপমাত্রার আনন্দ উপভোগ করা যায়। বর্ষাকালটা এড়িয়ে চলাই ভালো। ট্রিপ টিপস কীভাবে যাবেন – ট্রেনে এলে নামতে হবে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন। সেখান থেকে শেয়ার ট্যাক্সিতে বা গাড়ি রিজার্ভ করে প্রথমে মিরিক বাজার পর্যন্ত আসতে হবে, তারপর সেখান থেকে আবার ভাড়ার গাড়িতে বা শেয়ার ট্যাক্সিতে তাবাকোশি গ্রামে চলে আসা যায়।

বিমানের ক্ষেত্রে বাগডোগরা বিমানবন্দরে নেমে সরাসরি রিজার্ভ গাড়িতেও তাবাকোশি আসা যায় নতুবা মিরিকে এসে আবার ট্যাক্সি বা গাড়ি রিজার্ভ করে তাবাকোশি পৌঁছানো যায়। কোথায় থাকবেন –  তাবাকোশিতে একমাত্র হোম-স্টেই ভরসা। মাথাপিছু এখানে থাকা-খাওয়ার খরচ কমবেশি জনপ্রতি ১২০০ টাকা। কী দেখবেন – তাবাকোশি পার্ক, তাবাকোশি গ্রাম, তাবাকোশি পাবলিক পুল, রংবংখোলা নদী, নাগ মন্দির, বিষ্ণু মন্দির, গোপালধারা চা বাগান এখানকার বিশেষ দ্রষ্টব্যের মধ্যে পড়ে।

তাছাড়া সাইটসিইং-এর মধ্যে নিকটবর্তী মিরিক লেক, মিরিক বৌদ্ধমঠ, ভারত ও নেপাল সীমান্তে অবস্থিত পশুপতি বাজার, সীমানা ভিউ পয়েন্ট কিংবা জোড়পোখরিতেও ঘুরে আসা যায় গাড়ি ভাড়া করে। কখন যাবেন – বছরের যে কোনও সময় তাবাকোশি আসা যায়। তবে মার্চ মাস থেকে জুন মাসের মাঝামাঝি সময় অথবা অক্টোবর থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি উৎকৃষ্ট সময়। সতর্কতা – হোম-স্টে বুক করে তবেই আসা উচিত এখানে। নদীর স্রোত বুঝে তবেই পা ডোবানো উচিত। রাত্রে বাইরে ঘুরে না বেড়ানোই ভালো।

লেপচাদের গ্রামে তাদের অনুমতি ছাড়া গাছ থেকে কমলালেবু বা কোনও ফল, সবজি তোলা উচিত নয়।তাবাকোশি পাবলিক পুলে স্নানের জন্য না নামাই শ্রেয়। সর্বোপরি পাহাড়ের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করতে হবে। বিশেষ পরামর্শ – সঙ্গে ক্যামেরা আর দূরবীন থাকলে পাখি দেখতে দেখতেই ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেওয়া যায় আর রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষেরা তাবাকোশি থেকে ট্রেক করে মিরিক চলে যেতে পারেন।